রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও যানজট কমাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হয়েছে। রবিবার (১ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি রুটে ৮১৬টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৯৬টি নন-এসি এবং ২০টি এসি বাস। নতুন ব্যবস্থায় একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির অধীনে বাস চলাচল করবে। এতে যাত্রী ওঠানোর জন্য বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে এবং নির্ধারিত রুটে সুশৃঙ্খলভাবে গণপরিবহন পরিচালনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
তবে নতুন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হলেও শুরুতেই দেখা দিয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। রুট বরাদ্দ নিয়ে পরিবহন কোম্পানিগুলোর অসন্তোষ, বাসের ফিটনেস ও রংসংক্রান্ত জটিলতা এবং ইলেকট্রনিক টিকিটিং ব্যবস্থা চালু না হওয়া—সব মিলিয়ে উদ্যোগটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয়টি রুটে ছয়টি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হবে।
পরিকল্পনায় গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে ভিআইপি পরিবহনের ২৫৩টি বাস রাখার কথা রয়েছে। মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জের চুলকুটিয়া পর্যন্ত রুটে চলবে চিড়িয়াখানা সিটি বাসের ১৩৩টি বাস।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত রুটে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজের ৭০টি, ঘাটারচর থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত রুটে ফোর স্টার বাস লাইনের ১৫০টি এবং ঘাটারচর থেকে ধউর ব্রিজ পর্যন্ত রুটে পিএনপি সিটি সার্ভিসের ১৯০টি বাস চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে ঢাকা চাকার ২০টি এসি বাস পরিচালনার কথা রয়েছে। রুটভেদে বাসের রং আলাদা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে যাত্রীরা সহজে নির্ধারিত রুটের বাস শনাক্ত করতে পারেন।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত দিক হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ বাসই নতুন নয়। আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচল করা বাসগুলো মেরামত ও নতুন করে রং করে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসমালিকদের বিদ্যমান যানবাহন মেরামত ও নির্ধারিত রঙে রাঙানোর জন্য দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। যেসব বাসের ফিটনেস ঠিক নেই, সেগুলো নতুন ব্যবস্থায় চলতে পারবে না। ফলে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত ৮১৬টি বাসের সবগুলো একসঙ্গে রাস্তায় নামানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাসের ইলেকট্রনিক টিকিটিং, নির্ধারিত স্টপেজ এবং বাসমালিকদের প্রচলিত পরিচালনাপদ্ধতি থেকে বের করে আনার বিষয়গুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ব্যবস্থায় বাসের বাহ্যিক রূপ বদলালেও যাত্রীসেবায় কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর।
কার্যক্রম শুরুর আগেই কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির মধ্যে রুট বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ৩৬ বছর ধরে ফার্মগেট রুটে চলাচল করা রজনীগন্ধা পরিবহনকে কাঁচপুর রুট বরাদ্দ দেওয়ায় আপত্তি জানিয়েছে কোম্পানিটি। বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার জন্য ডিটিসিএর কাছে আবেদনও করা হয়েছে।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, রজনীগন্ধা, প্রজাপতি ও পরিস্থানসহ কয়েকটি কোম্পানি রুট বরাদ্দ নিয়ে সমস্যায় রয়েছে। কিছু বাসের ফিটনেস এবং নির্ধারিত রঙের মান নিয়েও জটিলতা আছে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক চলছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কয়েকটি কোম্পানি শুরুতে নতুন ব্যবস্থায় যুক্ত হতে না পারলেও কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে না। পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলো সমাধান করে সব কোম্পানিকে নির্ধারিত কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ডিটিসিএর বৃহত্তর পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি সমন্বিত রুটে নিয়ে আসা হবে। প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানি বাস পরিচালনার দায়িত্ব পাবে।
ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাস ৯৮টি রুটে চলাচল করছে। তবে অনুমোদিত রুটের সংখ্যা ৪১৮টি। যাত্রী চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা ও যান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন রুট কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যাত্রী ওঠানামা, যাত্রার শুরু ও গন্তব্য এবং যানবাহনের চলাচল নিয়ে জরিপ করেছে ডিটিসিএ। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা, ৩৫ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর যাত্রার উৎস ও গন্তব্য এবং নগরীর ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টার যানবাহন গণনার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কে অবকাঠামো ও প্রকৌশলগত জরিপ চালানো হয়।
ডিটিসিএর ধারণা, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রীর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত বাসস্টপ, কাউন্টারভিত্তিক ও ইলেকট্রনিক টিকিটিং এবং জিপিএস ট্র্যাকিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি রুটগুলোর বাসমালিকেরা ইলেকট্রনিক টিকিটিং বিষয়ে এখনো সম্মত হননি বলে জানা গেছে। এমনকি টিকিট কাউন্টার স্থাপন নিয়েও জটিলতা রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে এক পরিদর্শনে আটটি পরীক্ষামূলক রুটের প্রায় ৪০০টি নির্ধারিত বাসস্টপের মধ্যে ১৬৫টি বাস্তবায়িত হয়নি বলে উঠে আসে। ফলে শুধু রুট নির্ধারণ বা বাসের রং পরিবর্তন করলেই যাত্রীসেবায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাসের চালক ও সহকারীদের কমিশনভিত্তিক আয়ের পরিবর্তে মাসিক বেতন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কমিশনভিত্তিক আয়ব্যবস্থা যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা বাড়ানোর অন্যতম কারণ। নির্দিষ্ট বেতন চালু করা গেলে চালকদের মধ্যে অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাত্রী তোলার প্রবণতা কমতে পারে।
ছয়টি প্রধান রুটের পাশাপাশি ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় তিনটি চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি চক্রাকার রুটে ২০টি করে মোট ৬০টি বাস রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে ২৫টি চক্রাকার রুটে নতুন ও তুলনামূলক ছোট বাস চালুর উদ্যোগ রয়েছে। প্রায় দুই মাসের মধ্যে এসব বাস চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের আলোচনা নতুন নয়। ২০০৪ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বিষয়টি উঠে আসে। পরে ২০১৫ সালে সাবেক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগটি নতুন করে সামনে আনেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে পরীক্ষামূলক বাস চলাচল শুরু হলেও তা প্রত্যাশিতভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ২০২৫ সালেও গাবতলী-চাষাঢ়া রুটে আরেকটি উদ্যোগ সফলভাবে এগোয়নি।
যাত্রী অধিকারকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর সঙ্গে আধুনিক বাস, নির্ধারিত স্টপেজ, কার্যকর টিকিটিং, চালকদের বেতন কাঠামো এবং অননুমোদিত বাস চলাচল বন্ধ করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে ছয় রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের মধ্য দিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন সংস্কারের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। তবে বাসের রং ও কোম্পানির নাম বদলের বাইরে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও স্বস্তিদায়ক সেবা নিশ্চিত করা যায় কি না—সেই পরীক্ষাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।