ঢাকাকে বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান

ভোরের ডাক ডেস্ক

রাজধানী

বাংলাদেশের নগরায়ণকে কেবল বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, ফ্লাইওভার ও আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের জীবনমান, সামাজিক সংযোগ,

2026-10-30T19:19:18+00:00
2026-10-30T19:19:18+00:00
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
 
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানী
আইপিডির আলোচনা সভায় বক্তারা
ঢাকাকে বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান
ভোরের ডাক ডেস্ক
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের নগরায়ণকে কেবল বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, ফ্লাইওভার ও আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের জীবনমান, সামাজিক সংযোগ, পরিবেশগত ভারসাম্য ও সাম্যের ভিত্তিতে নতুন উন্নয়ন দর্শন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।

বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে শুক্রবার অনলাইনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আইপিডির অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের নগরায়ণের উন্নয়ন দর্শন’।

আমাদের শহরগুলোকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক কিংবা টোকিও, লন্ডন ও নিউইয়র্কের আদলে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বন্ধ করা দরকার উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের নগরায়ণে বিদেশি নগর মডেলের অন্ধ অনুকরণ না করে দেশের নিজস্ব ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি, পুকুর, উঠান, পাড়া-মহল্লার সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু ভবনের উচ্চতা কিংবা অবকাঠামোর পরিমাণ দিয়ে নয়; বরং একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে সংযুক্ত, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এগুলো শুধু বসবাসের স্থান বা প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; বরং পারস্পরিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ, সহযোগিতা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং কমিউনিটিভিত্তিক জীবন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রও ছিল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে এসব সামাজিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

অধ্যাপক আদিল বলেন, আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা কেন এমন শহর গড়ে তুলতে পারব না, যেখানে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি পুকুর থাকবে, শিশুদের খেলার মাঠ থাকবে, মানুষের মিলনস্থল থাকবে এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে চিনবে? উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।

আইপিডি বলেছে, কিশোর গ্যাং বা কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা কমাতে নিরাপদ খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

আইপিডির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নগরায়ণের জন্য ‘পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ’ ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ধারণায় পুকুর ও জলাশয় হবে পরিবেশগত ভারসাম্য ও পানি ব্যবস্থাপনার অংশ; উঠান, কমিউনিটি স্পেস ও উন্মুক্ত স্থান হবে সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র; আর পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় পরিচয়, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রতিবেশী সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। এটি অতীতের নগরব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়; বরং ঐতিহ্যের ইতিবাচক উপাদানগুলোকে আধুনিক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনায় পুনঃস্থাপনের একটি প্রস্তাব।

অনুষ্ঠানে আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, কেবল জিডিপির উন্নয়ন বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণকেই নগরায়ণ বলা চলে না। প্রকৃত নগরায়ণ হতে হবে মানুষের কল্যাণে, যেখানে নগরের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অধিকার নিশ্চিত হবে। নগর এলাকায় পাড়া, নেইবারহুড ব্লক ও শহরের জন্য বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সুবিধার সুষম বিন্যাস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণে অর্থনৈতিক করিডোরভিত্তিক উন্নয়নের পরামর্শ দেন এই পরিকল্পনাবিদ।

বিআইপির সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন দর্শন নয়, বরং ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠীস্বার্থই নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে আমাদের শহরগুলো। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি কিংবা দ্বিতীয় সারির শহরগুলোতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবাসিক এলাকা এখন কেবল ঘুমানোর জায়গা, অথচ নগর দর্শনে আবাসিক এলাকাগুলো প্রাণবন্ত কমিউনিটিভিত্তিক এলাকা হওয়ার কথা ছিল।

আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ উল্লাহ নগরের ন্যায়বিচারের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, নগরের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পুঁজি, নিখুঁত নকশা কিংবা মানুষের অংশগ্রহণ নয়। মানুষের সুখ ও কল্যাণের দিকে নগরের আসল যাত্রা এখনো শুরুই হয়নি। অর্থশাস্ত্রের হিসাব অনুযায়ী হয়তো নগরবাসী ভালো আছেন বলে মনে হয় এবং এই নগরকেই অর্থনীতি ও উন্নত জীবনের কেন্দ্র দাবি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই ধরনের মানবিক নগর আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। তাই নগরের উন্নয়নের মূল যাত্রাটিই আজ বড় প্রশ্নের মুখে।

উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মধ্যকার মৌলিক ফারাক তুলে ধরে আইপিডির রিসার্চ ফেলো অধ্যাপক ফরহাদুর রেজা বলেন, উন্নয়নকে আমরা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব, সেটাই এখন মূল বিষয়। আজকাল কেবল প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করে সেটিকে উন্নয়নের রূপ দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনার আড়ালেই থেকে যায়। তিনি নগরের যেকোনো স্থানে সাধারণ মানুষের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব গুরুত্ব দেন জনবান্ধব নগরায়ণের ওপর। তিনি বলেন, নগরায়ণ মানেই নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করা নয়। বরং মানুষ যেখানে বসবাস করছে, সেখানেই সব প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা নগরায়ণের প্রধান শর্ত। নগরের প্রতিটি মানুষের জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে।

আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, জলাভূমি ও উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস এবং কর্মসংস্থানের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন নগর সংকটকে ক্রমাগত গভীর করছে।

ভূমি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নগরের ওপর সার্বিক চাপ কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে বক্তব্য দেন পরিকল্পনাবিদ জিনিয়াস জান্নাত। তিনি বলেন, সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা থাকলে সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি উদ্যোগ বা বিশাল অর্থ ব্যয় করতে হয় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়ের বিষয়টি তুলে ধরে পরিকল্পনাবিদ কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, বিশাল পরিকল্পনা মানেই বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়। সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের উন্নয়নের মূল লক্ষ্য।

ঢাকাসহ বাংলাদেশের টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে আইপিডির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

১. নিজস্ব নগরায়ণ দর্শন প্রণয়ন: বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নগরায়ণ নীতি ও পরিকল্পনায় মানবিক নগরায়ণের দর্শন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২. পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ: পুকুর, খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা চিহ্নিত করে আইনগত সুরক্ষা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এসব জলাশয়ের ব্যবস্থাপনায় পাড়া-মহল্লার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

৩. পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা: নতুন আবাসন প্রকল্পে শিশুদের খেলার জায়গা, উন্মুক্ত স্থান, কমিউনিটি স্পেস, হাঁটার পথ ও সামাজিক যোগাযোগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো আবাসিক এলাকাতেও এসব সুবিধা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।

৪. শিশু-কিশোরবান্ধব নগর গড়ে তোলা: প্রতিটি ওয়ার্ডে মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের প্রাপ্যতা মূল্যায়ন করে এলাকাভিত্তিক ঘাটতি নিরূপণ করতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ, সহজে পৌঁছানো যায় এবং নিয়মিত ব্যবহারযোগ্য খেলার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন: আবাসন পরিকল্পনায় শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা ও নিরাপত্তা নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহাবস্থান, জনপরিসরে প্রবেশাধিকার এবং প্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. পরিকল্পনা ও সামাজিক কার্যক্রমের সমন্বয়: স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক উদ্যোগ পরিচালনা করতে হবে।

আইপিডির অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের নগরায়ণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা জমির অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ, প্রকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ। একটি শহরে কতগুলো বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, তার পাশাপাশি সেখানে কত শিশু নিরাপদে খেলতে পারে, কত মানুষ সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানে যেতে পারে এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে কতটা সামাজিক সংযোগ রয়েছে—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত।


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: