রাজধানীর মিরপুরে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এতে মিরপুর-১০ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দিনভর উত্তপ্ত ছিল মিরপুরের পরিস্থিতি।
রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে মিরপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও তারা সড়ক ছাড়ছিলেন না। জনভোগান্তি কমাতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও বাঁশি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
মহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশের ধারণা, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় তিনি প্রকাশ করেননি।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি, কাউকে আটকও করা হয়নি। পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি। বর্তমানে সড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।
সড়ক পরিষ্কারের সময় সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া এবং তাঁদের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বলেন, সড়ক পরিষ্কারের সময় পুলিশ ওই এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিয়েছিল। কারও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে রবিবারবার সকাল থেকেই ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক বেতনের দাবিতে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।
সকাল ৯টার দিকে শ্রমিকেরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নেন। এতে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪, পল্লবী ও আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংঘর্ষের তীব্রতা কমে আসে।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা হামিদুর রহমান জানান, আগুন নেভাতে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে গেলে তাঁদেরও ধাওয়া দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুর ১২টার দিকে সংঘর্ষের পর স্টেশনগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে মেট্রোরেল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এতে মেট্রোরেল ব্যবহারকারী যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। তবে সর্বশেষ পরিস্থিতিতে স্টেশনগুলো পুনরায় চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিচারপতি শেখ আশফাকুর রহমানকে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন।
শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নতুন মজুরি বোর্ড গঠন। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শাহ আলী এলাকায় কয়েকটি মার্কেট ও পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
এ ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া ও গাজীপুরের প্রায় ৫০টি কারখানা এবং মিরপুরের অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়। শনিবারের সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন চলছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের দাবি কতটা পূরণ হয় এবং চলমান অসন্তোষের অবসান ঘটে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।