রাজধানীর মিরপুরে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনরত তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। সকাল ৮টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। পরে মিরপুর-১১, ১২, ১৪ ও পল্লবীসহ আশপাশের এলাকায়ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, বেলা সোয়া ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে পুলিশ বারবার অনুরোধ জানায়। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ধাওয়া শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়।
এতে শ্রমিকেরা প্রথমে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে বিভিন্ন দিক থেকে সংগঠিত হয়ে আবারও পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে মিরপুর-১০ এলাকায় সংঘর্ষের তীব্রতা কমে আসে।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি কর্মকর্তা হামিদুর রহমান জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট পাঠানো হয়েছে।
বন্ধ মেট্রোরেলের পাঁচ স্টেশন
শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে মেট্রোরেল চলাচলেও। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনও বন্ধ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মেট্রোরেল পুলিশের অপারেশন বিভাগের পরিদর্শক মোহসীন শেখ তিনটি স্টেশন বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে পাঁচটি স্টেশন বন্ধ থাকার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের অবরোধের কারণে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪, পল্লবী, মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কর্মস্থলগামী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেককে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
প্রায় ৪০ মিনিটের সংঘর্ষের পর দুপুর ১২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিরপুর-১০ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সীমিত পরিসরে কিছু যানবাহন চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে মিরপুর-২, ১১ ও ১৪ নম্বর এলাকার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, সকাল থেকেই মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বৈঠক শেষে তিনি জানান, শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা সত্ত্বেও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক বেতনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকে।
একপর্যায়ে শ্রমিকেরা মিরপুর-১ নম্বরের শাহ আলী এলাকায় জড়ো হন। সেখানে কয়েকটি মার্কেট ও পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কালশী এলাকায় একটি পোশাক কারখানা লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন ও সংঘর্ষের কারণে মিরপুরের শিল্পাঞ্চল ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দাবি পূরণে মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম কত দ্রুত এগোয়, এখন সেদিকেই নজর শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট মহলের।