রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শহরের একটি জনপ্রিয় জাদুঘর ও পার্ক কমপ্লেক্সে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কার কথা জানিয়ে মার্কিন নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির দূতাবাস। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সতর্কবার্তা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এফএসবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) মস্কোর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত সারিৎসিনো মিউজিয়াম রিজার্ভকে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কতা জারি করে মার্কিন দূতাবাস। দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ওই দিনই সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে—এমন বিশ্বাসযোগ্য হুমকির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
দূতাবাসের সতর্কবার্তায় মস্কোর দোলস্কায়া উলিৎসা এলাকার সারিৎসিনো মিউজিয়াম রিজার্ভ এবং এর আশপাশে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জনসমাগম এড়িয়ে চলা, আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তার পর রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি জানিয়েছে, মস্কোয় সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে মার্কিন অংশীদারদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে তারা।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে সংস্থাটি জানায়, প্রতিষ্ঠিত সহযোগিতার চ্যানেলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ তথ্য এসেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা কারা করছে, হামলার ধরন কী হতে পারে কিংবা এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি এফএসবি।
নিরাপত্তা হুমকির পর সারিৎসিনো মিউজিয়াম রিজার্ভ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেখানে চলমান একটি কনসার্টের মাঝপথে দর্শনার্থীদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংগীতশিল্পী লিলিয়া পেচেনকিনা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম অস্টোরঝনো, নভোস্তিকে জানান, অনুষ্ঠানের শেষ গান পরিবেশনের সময় মাইকে এলাকা খালি করার ঘোষণা আসে।
এরপর দর্শনার্থীদের দ্রুত প্রাঙ্গণ ছাড়তে বলা হয়। রুশ সংবাদ সংস্থা আরআইএর বরাতে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশে জাদুঘর ও পার্ক এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয় এবং কমপ্লেক্সটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
তবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রথমদিকে নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তাকর্মীরা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কারিগরি কারণে এলাকা বন্ধ রাখা হয়েছে।
রুশ টেলিগ্রাম চ্যানেল বাজা জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে প্রায় ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পুলিশি যানবাহন দিয়ে পুরো এলাকার চারপাশে নজরদারি চালানো হয়। তবে সদস্যসংখ্যার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য হামলার তারিখ হিসেবে ৩১ অক্টোবর উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে সারিৎসিনো এলাকায় কোনো হামলা বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
রুশ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনাকারী বা সন্দেহভাজনদের বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। কোনো গ্রেপ্তারের আনুষ্ঠানিক খবরও পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
মস্কোয় নতুন করে হামলার আশঙ্কা রাশিয়ায় ২০২৪ সালের ভয়াবহ ক্রোকাস সিটি হল হামলার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
২০২৪ সালের ২২ মার্চ মস্কোর উপকণ্ঠে ক্রোকাস সিটি হলে একটি কনসার্ট চলাকালে বন্দুকধারীরা হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৪৫ জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হন। ইসলামিক স্টেটের আফগানিস্তানভিত্তিক শাখা আইএস-কে ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
ওই হামলার আগেও মস্কোয় সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের মার্চের শুরুতে মার্কিন দূতাবাস জনসমাগমস্থলে হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলেছিল।
তবে সে সময় রাশিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান সের্গেই নারিশকিন মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যকে অত্যন্ত সাধারণ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তথ্যের ভিত্তিতে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এবারও যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তার পর রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থার তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতেও সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার তথ্য দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফএসবি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সহযোগিতার চ্যানেল ব্যবহার করেই হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে তারা।
তবে সম্ভাব্য হামলার পেছনে কারা রয়েছে, হামলার পরিকল্পনা কতটা অগ্রসর হয়েছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী কোনো সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করতে পেরেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে মস্কোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজর অব্যাহত রয়েছে।