আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আবারও বাড়ছে আফিম চাষ। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাওয়া কৃষকেরা গম ও তুলার মতো বৈধ ফসল ছেড়ে ফিরছেন পোস্ত চাষে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি)–এর ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটিতে পোস্ত চাষের জমি বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৪৩ হাজার ৩০০ হেক্টরে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় চার গুণের বেশি।
শুধু চাষের জমিই নয়, বেড়েছে আফিম উৎপাদনও। ইউএনওডিসির হিসাব অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ২৯৬ টন আফিম উৎপাদিত হলেও চলতি বছর তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৬৬ টনে পৌঁছেছে—অর্থাৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। ২০২২ সালে তালেবান মাদক নিষিদ্ধ করার পর এটিই আফিম চাষ ও উৎপাদনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন। তবে ২০২১ সালের তুলনায় চাষের পরিমাণ এখনো অনেক কম।
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বালখ প্রদেশের কৃষক মোহাম্মদ দাউদের অভিজ্ঞতা দেশটির গ্রামীণ সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরে। একসময় পোস্ত চাষের আয় দিয়ে সারা বছর পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারতেন তিনি। এখন গম ও তুলা চাষ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর সন্তানেরা অপুষ্টিতে ভুগছে।
কৃষকদের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও সেচের পানির সংকটে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে গমের আয় অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ মেটানোর কাছাকাছি থাকছে, আর তুলার দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের লাভের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে। বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া ও বাজারে পণ্য পৌঁছানোর বাধাও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
ইউএনওডিসির আফগানিস্তানবিষয়ক প্রতিনিধি পোল্লেক ওক সেরেই রয়টার্সকে বলেছেন, অনেক কৃষকের কাছে পোস্ত চাষে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না। বৈধ ফসল থেকে পর্যাপ্ত আয় না হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অবৈধ চাষ বন্ধ রাখা কঠিন—এ বাস্তবতাই নতুন পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হচ্ছে।
তালেবানের নিষেধাজ্ঞা ও উচ্ছেদ অভিযান এড়াতে কিছু কৃষক এখন গম-যবের খেতের মধ্যে ছোট ছোট পোস্তখেত তৈরি করছেন। কেউ কেউ আবার উঁচু দেয়ালঘেরা জায়গায় পোস্ত চাষ করছেন, যাতে বাইরে থেকে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়।
ইউএনওডিসির স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এভাবে লুকিয়ে চাষের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়েও সব পোস্তখেত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ১৬টিতে পোস্ত চাষ শনাক্ত হয়েছে—গত বছরের তুলনায় পাঁচটি প্রদেশ বেশি।
আফিম চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি থেকে আয়ও বেড়েছে। ইউএনওডিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আফগানিস্তানে আফিম বিক্রি থেকে আনুমানিক ৫২৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। ২০১৮ সালের পর ২০২২ সালের ব্যতিক্রম বাদ দিলে এটি সর্বোচ্চ আয়।
আফগানিস্তানে একসময় বিশ্বের মোট আফিমের প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদিত হতো। এই আফিম থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত মরফিনের মতো ওষুধের উপাদান তৈরি করা যায়; পাশাপাশি অবৈধভাবে হেরোইন উৎপাদনেও এটি ব্যবহৃত হয়। ২০২২ সালে তালেবান পোস্ত চাষ ও মাদক উৎপাদন নিষিদ্ধ করার পর চাষের জমি দ্রুত কমে যায়। কিন্তু বৈধ বিকল্প আয়ের অভাব সেই অগ্রগতিকে এখন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
জাতিসংঘের নতুন পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, প্রকৃত চাষের পরিমাণ ইউএনওডিসির হিসাবের প্রায় অর্ধেক। তালেবান আরও জানিয়েছে, নিষিদ্ধ পোস্তখেত ধ্বংসের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বছর ২২ হাজার হেক্টরের বেশি জমির পোস্ত ধ্বংস করার দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপনে চাষের কারণে কিছু জমি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
আফিম চাষে প্রত্যাবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো গ্রামীণ পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা। বৈধ ফসল থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে কৃষকদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর উদ্বেগ, কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প ফসল, নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে অবৈধ চাষ কমিয়ে রাখার উদ্যোগ টেকসই হবে না। বাগানভিত্তিক ফল ও বাদাম চাষের মতো বিকল্প থাকলেও সেগুলো থেকে আয় পেতে সময় লাগে এবং নিয়মিত পানি ও বাজারের সুযোগ প্রয়োজন।
আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন বাড়লে আন্তর্জাতিক অবৈধ মাদক সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আফিম থেকে তৈরি হেরোইনের বাজারে নতুন করে সরবরাহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের উদ্বেগ।
তবে চাষের জমি ও উৎপাদন বেড়েছে বলেই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ একই হারে বেড়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়। মজুত, পাচারপথ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত আফিমের কতটা বাজারে পৌঁছাচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, আফগানিস্তানে পোস্ত চাষের পুনরুত্থান শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, জলবায়ুর চাপ এবং কৃষকদের বিকল্প জীবিকার অভাব। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য টেকসই আয়ের ব্যবস্থা করা না গেলে তালেবানের মাদকবিরোধী অভিযান আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।