ইরানকে চাপে রেখেও স্বস্তিতে নেই ওয়াশিংটন!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করলে তার প্রভাব মোকাবিলায় দেশটির হাতে কয়েক মাসের খাদ্য ও জ্বালানির মজুত রয়েছে।

2026-10-29T16:55:26+00:00
2026-10-29T16:55:26+00:00
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানকে চাপে রেখেও স্বস্তিতে নেই ওয়াশিংটন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৫ পিএম 
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের ওপর সামরিক হামলা শুরু করলে তার প্রভাব মোকাবিলায় দেশটির হাতে কয়েক মাসের খাদ্য ও জ্বালানির মজুত রয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাম্প্রতিক গোপন মূল্যায়নের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। ফলে দীর্ঘ আট মাসের সংঘাতে ইরান অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়লেও নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু হলেই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেখছে না ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ইতিমধ্যে ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এর মধ্যে গোলাবারুদ ব্যবহারের ব্যয়ই প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবেও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও নৌ অবরোধের কারণে ইরান উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। তবে দেশটির খাদ্য ও জ্বালানির মজুত নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।

এর আগেও মে মাসে প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান অন্তত তিন থেকে চার মাস নৌ অবরোধের চাপ সহ্য করতে পারে। ওই মূল্যায়নে দেশটির উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বজায় থাকার কথাও উঠে এসেছিল। তবে এসব মূল্যায়ন ইরানের সব ধরনের সরবরাহ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিংবা সামরিক সক্ষমতা অক্ষত থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।

নতুন হামলার হুমকি বাস্তবায়িত হলে তেহরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা নিয়েও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ করছে। মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে বিদেশে হামলা কিংবা মার্কিন স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্য করে সাইবার অভিযান চালানোর আশঙ্কাও মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপ—ইরান এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য নয়।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যালোচনা করা মার্কিন সামরিক নথি অনুযায়ী, যুদ্ধের ব্যয় গত কয়েক সপ্তাহেই ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার এবং ধ্বংস বা হারানো সামরিক সরঞ্জাম ও প্ল্যাটফর্মের ক্ষতি পূরণে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অন্যান্য ব্যয়ও মোট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।

বিভিন্ন বাহিনীর ব্যয়ের হিসাবেও বড় অঙ্ক উঠে এসেছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যয় প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, স্থলবাহিনীর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এবং নৌবাহিনীর প্রায় ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে পেন্টাগনকে বিদ্যমান বাজেটের বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি যুক্ত হলে মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই হিসাব যুদ্ধের আর্থিক চাপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও তুলে ধরছে। 

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে এই জলপথের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোও চাপে পড়তে পারে।

যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এর প্রভাব জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে পড়ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।

যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি সচল করার লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন সমঝোতার চেষ্টা চলছে। ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ অবসানের একটি নতুন খসড়া প্রস্তাব ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রস্তাবটিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ, মধ্যস্থতার উদ্যোগ চললেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 

আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোন পক্ষ আগে কী ধরনের ছাড় দেবে, সেই প্রশ্ন। ওয়াশিংটন চায়, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ মেনে নেওয়ার মতো বিষয়ে শুরুতেই ছাড় দিক। অন্যদিকে, তেহরান মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

দুই পক্ষের অবস্থানের এই পার্থক্য দূর করা না গেলে যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সামরিক সংঘাত আবারও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারণা দিয়েছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাতের অবসান হতে পারে। কিন্তু আট মাস পার হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। ওয়াশিংটন যুদ্ধের ব্যয় বহন করছে, অন্যদিকে ইরানও অর্থনৈতিক চাপ, অবরোধ ও সামরিক হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের ব্যয় ও জ্বালানির দাম রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললেও নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছে। 

সব মিলিয়ে, ইরানের খাদ্য ও জ্বালানির মজুত দেশটিকে কয়েক মাস চাপ সামলানোর সুযোগ দিতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অবরোধ, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ও অবকাঠামোগত ক্ষতি দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয় এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা—দুটিই বাড়তে পারে।

তাই ইরানের মজুতের সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি—কোনোটিই এককভাবে যুদ্ধের দ্রুত পরিণতি নিশ্চিত করছে না। আপাতত সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই পক্ষের সামরিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক চাপ এবং চলমান কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফলের ওপর।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: