যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নাগালের মধ্যে আনতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ডেটাবেস বা ‘টার্গেট ব্যাংক’ হালনাগাদের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের হুমকি বা হামলার জবাবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পাল্টা পদক্ষেপ নিতে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন খামেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য নতুন সংঘাত মোকাবিলায় সামরিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে সামরিক বা সন্ত্রাসী হামলা চালালে সেই সংঘাত কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, তা নির্ধারণ করবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণ। তাঁর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষের প্রতিটি পর্যায়ের ও ধরনের হুমকির জবাব দিতে হবে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে—কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় নিজেদের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ না রেখে।
খামেনির নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সব ধরনের বস্তুগত ও অবস্তুগত সম্পদ’ ইরানের সামরিক বাহিনীর নাগালের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যেই ‘টার্গেট ব্যাংক’ হালনাগাদ করতে বলেছেন তিনি। তবে এই ডেটাবেসে ঠিক কোন কোন স্থাপনা, সামরিক অবকাঠামো, সম্পদ বা নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠকে তিনি সামরিক বাহিনীর ‘বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধপ্রস্তুতি’ বজায় রাখার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সামরিক গোয়েন্দা ও তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা মতবাদ ও রণকৌশল উন্নত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদের নির্দেশ দেন তিনি।
বৈঠকে ইরানের সেনাবাহিনী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা পারস্য উপসাগরীয় উপকূল, হরমুজ প্রণালি, ওমান সাগর এবং দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে খামেনিকে অবহিত করেন। বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ, নজরদারি সরঞ্জাম এবং সহায়ক ও যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানোর বিষয়েও তাঁকে জানানো হয়।
খামেনির এই নির্দেশ এমন এক সময়ে এল, যখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, অনুমোদনহীন পথে চলাচলের সময় চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায় ও সেগুলো বিস্ফোরিত হয়। তবে ইরানের এই দাবির সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ছেড়ে যাওয়ার সময় একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে কোনটি ইরানের দাবিতে উল্লেখ করা চারটি ট্যাংকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও পরস্পরবিরোধী। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলাচলের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, প্রণালির প্রধান নৌপথ থেকে ইরানের পেতে রাখা মাইন সরানো হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে’। তবে ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চান বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আল-জাজিরার ৩১ অক্টোবরের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের একটি প্রতিনিধি দল আলোচনার জন্য আবার তেহরানে ফিরেছে। ইরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চিঠিও পেয়েছে তেহরান। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী মধ্যস্থতার বিষয়ে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে দুই পক্ষ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখনো অমীমাংসিত।
বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যবস্তুর ডেটাবেস হালনাগাদ এবং ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার নির্দেশ ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত। তবে এই নির্দেশ বাস্তবে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেবে, কিংবা চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এর কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।