
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে মরদেহগুলো নেওয়া হয় নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের নিথর দেহ ফিরে পেলেও পরিবারগুলোর শোক যেন আরও গভীর হয়েছে। স্বজনদের শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শোকের পাশাপাশি এখন পরিবারগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন—যে মানুষটি সংসারের হাল ধরেছিলেন, তাঁকে ছাড়া কীভাবে চলবে বাকি জীবন?
বিশেষ করে নওগাঁ পৌর এলাকার শাহিনের পরিবারের পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ। পরিবারের সদস্যরা একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শাহিন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গেলেও কয়েক মাসের মধ্যেই কারখানার আগুনে প্রাণ হারান তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্বজনেরা। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের বোঝাও তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে।
দেশে ফেরা অন্য শ্রমিকদের পরিবারের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। প্রিয়জন হারানোর শোক সামলানোর আগেই তাঁদের ভাবতে হচ্ছে সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। একদিকে স্বজনের মৃত্যুর বেদনা, অন্যদিকে জীবিকা হারানোর অনিশ্চয়তা—দুই সংকটে পড়েছে পরিবারগুলো।
সৌদি দূতাবাসের পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, দেশে ফেরা সাত শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁয়। তাঁদের চারজন আত্রাই উপজেলার এবং একজন নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁরা হলেন—নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
অন্য দুজন হলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার সাব্বির হোসেন ও মোহাম্মদ শামিম।
শনিবার বিকেলে নওগাঁর পাঁচ শ্রমিকের মরদেহ তাঁদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। লাশবাহী গাড়ি পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ভিড় করেন। মুহূর্তেই কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছিল। বাকি সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বাকি সাতজনের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানানো হয়। শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিজি-৩৩৬-এ তাঁদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতাও করা হবে।
সৌদি আরবের একটি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা। প্রথম দফায় নয়জনের পর বাকি সাতজনের মরদেহও দেশে ফিরল। কিন্তু যাঁদের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা, তাঁদের আর জীবিত ফিরে পাওয়া হলো না। রয়ে গেল শুধু স্মৃতি, শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতা।