বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে তাঁর জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজন মোটরসাইকেলে করে রাজধানীর উত্তরা থেকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কিছু সময় অবস্থানের পর তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে একাই মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান তিনি।
তবে টঙ্গীর ওই এলাকায় যাওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল, কেন দুজন আলাদা হয়ে গেলেন এবং তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পৌঁছালেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। দ্বীপের দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্ত সংস্থা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের পরিদর্শক সাজেদুর রহমান।
তিনি বলেন, তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দ্বীপকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় আসেন। সেখানে কিছু সময় অবস্থানের পর তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করেন দ্বীপ। পরে তাঁকে না পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান। রাত আড়াইটার দিকে তিনি বাসায় পৌঁছান বলে জানিয়েছেন।
পিবিআই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই এলাকায় তাঁরা দুজনই এসেছিলেন বলে দ্বীপ জানিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিলেন না। ঘোরার উদ্দেশ্যেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি। তবে সেখানে যাওয়ার পর কী ঘটেছিল, কোথায় অবস্থান করেছিলেন এবং কী কারণে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলো, তা এখনো তদন্তাধীন।
এর আগে জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ জানিয়েছিলেন, টঙ্গীর হোন্ডা রোড ও হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানের সময় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে দুজন দুই দিকে দৌড় দেন। তাহসিফ নদীর দিকে চলে যান এবং পানিতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দ্বীপ পালিয়ে আসেন বলে দাবি করেছেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়া করা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের পোশাক পরা ছিলেন বলেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন দ্বীপ। তবে তাঁরা কারা, কেন ধাওয়া করেছিলেন কিংবা তাঁদের সঙ্গে তাহসিফের কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পিবিআই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকাটি মাদক কারবারিদের আনাগোনার জায়গা হিসেবে পরিচিত। ধাওয়া করা ব্যক্তিরা মাদক কারবারি হতে পারেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই। দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পিবিআই কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ও ইঞ্জিন নম্বর যাচাই করে মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তাহসিফ যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন, সেটিই উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই চলছে।
দ্বীপকে আটক করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁকে আটক করা হয়নি। ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রথম দিকে তিনি কিছুটা ভয় পেলেও পরে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এর আগে দ্বীপ তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন। পরে দুজনকে আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে বের হতে দেখা যায়। পরিবারের দাবি, দ্বীপের ডাকেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। হাতের ঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে স্বজনেরা তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তাহসিফের মৃত্যু হত্যা, আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা—এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পিবিআই কর্মকর্তা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
এ ঘটনায় মূল তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিবেচনায় পিবিআই ছায়া তদন্তের পাশাপাশি দ্বীপের দেওয়া তথ্য, ঘটনাস্থল, মোটরসাইকেল এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।