বন্ধুস্থানীয় ছোটভাইয়ের ফোন পেয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। মাকে জানিয়েছিলেন, দ্বীপ নামের ওই পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন। কিন্তু আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। এদিকে, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটিরও এখনো সন্ধান মেলেনি। ঘটনাটি তদন্ত করছে নৌ পুলিশসহ একাধিক সংস্থা।
তাহসিফের পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামের এক পরিচিত ছোটভাই বাসার নিচে এসে তাঁকে ডাকেন। এরপর মাকে জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ।
তাঁর বাবা এনায়েতুল করিমের ভাষ্য, রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফ তাঁর মায়ের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানান। কিন্তু এরপরও তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তাঁরা।
পরিবারের এক স্বজনের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বীপের সঙ্গে কথা বলেছে পরিবার। দ্বীপ তাঁদের জানিয়েছেন, রাতে তাঁরা একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। পরে তাহসিফকে তাঁর বাসার এলাকার কাছাকাছি রেখে তিনি ফিরে যান। তবে এরপর তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাটে গেলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পুলিশও তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ বাইরে যাওয়া ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাহসিফের পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তাঁর মোটরসাইকেলটির অবস্থান। পরিবারের এক স্বজন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি নিজের বাইক নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেটি আর বাসার গ্যারেজে পাওয়া যায়নি।
ওই স্বজনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ বাইকটির বিস্তারিত তথ্য ও ছবি চেয়েছে। পরিবার সেগুলো পুলিশকে দিয়েছে। বাইকটি কোথায় রয়েছে, সেটি কীভাবে নিখোঁজ হলো এবং এর সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো জানা যায়নি।
বুধবার বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, দৃশ্যমান আলামত দেখে এখনই মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধসহ বিভিন্ন সম্ভাবনা তদন্তে বিবেচনায় থাকতে পারে। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে যুক্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, মরদেহের অবস্থান ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাহসিফ মাঝেমধ্যে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যেতেন। ঘটনার দিনও তিনি উত্তরা এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে তিনি কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হলো, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের একটি ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে ওই ভিডিওর সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের বিস্তারিত জানার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন। ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে কোনো শত্রুতার যোগসূত্র আছে কি না, এমন প্রশ্নেরও তিনি তদন্তের আগে উত্তর দিতে চাননি।
তাহসিফের পরিবার এখনো কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, মোটরসাইকেলটি কোথায় এবং শেষবার সঙ্গে থাকা ব্যক্তির বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের মিল কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।