ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও সহিংসতা ঠেকানো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম ও সংঘাতের অভিজ্ঞতার মধ্যে এবার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কঠোর আচরণবিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে এখন প্রশ্ন, ইউপি ভোটে কারচুপি-সহিংসতা ঠেকানো যাবে তো?
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো আরও উন্নত করার চেষ্টা থাকবে।
সিইসি বলেন, একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করেই কমিশনের দায়িত্ব শেষ হয় না। দেশে এমন নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের প্রতিটি নির্বাচন একই মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত হয়। এ জন্য রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সাংবাদিক ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই আলোচনায় বসতে চায় ইসি। সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন থাকতে পারে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নির্বাচনে জালিয়াতি হলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতা ও প্রাণহানির আশঙ্কাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কমিশন। অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে। তাই আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হবে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরাও থাকবে। এর মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা, অনিয়ম কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ডে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিইসি বলেন, আচরণবিধি বাস্তবায়নে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নির্বাচনী অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিতে নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কালো টাকা ব্যবহার ও ভোট কেনার অভিযোগ পাওয়া গেলেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং এরপর পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসএসসি পরীক্ষা ও বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ হিসেবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সেবা কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেন সিইসি।
সিইসি জানান, আসন্ন ইউপি নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রয়েছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, তরুণদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ বাড়াতে যাঁদের বয়স ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তাঁদের ভোটার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করছে কমিশন।
ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সিইসির ভাষ্য অনুযায়ী, এ কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সিইসি। তাঁর ভাষ্য, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে যাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, নির্ভুল ভোটার তালিকা ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিইসি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির কাজও কমিশন করেছে। তাঁর দাবি, কমিশনের দৃঢ় অঙ্গীকারের কারণেই এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
নির্বাচনী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সিইসি। তিনি জানান, সাংবাদিকেরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।
জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র কমিশন থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রেস ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
নির্বাচনী অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, কালো টাকার ব্যবহার ও ভোট কেনা ঠেকানো এবং নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন সিইসি। তাঁর মতে, নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও অনলাইন হয়রানি বড় বাধা। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
সবশেষে সিইসি বলেন, ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেটিই কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।