তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন ছক, প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ে যত জট

অনলাইন ডেস্ক

জাতীয়

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। তবে এই সরকার কীভাবে গঠিত

2026-10-27T19:52:33+00:00
2026-10-27T19:52:33+00:00
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন ছক, প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ে যত জট
অনলাইন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। তবে এই সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কে হবেন প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হবে—এসব প্রশ্নে এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও বাছাইয়ের কয়েকটি ধাপ নিয়ে রাজনৈতিক মতভিন্নতা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি। সর্বশেষ আলোচনায় সংসদের উচ্চকক্ষকে কেন্দ্র করে নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের স্পিকার কিংবা নতুন করে সৃষ্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে থাকা ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের পাশাপাশি এর গঠনপ্রক্রিয়াও এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সরকারপ্রধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার স্বচ্ছ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরির আশঙ্কা থেকে যাবে।

উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব

গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, কাঠামো, আকার, কর্মপরিধি ও এখতিয়ার নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না করে বহাল রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ রাখা যায় কি না, তা বিবেচনার প্রস্তাব এসেছে।

এ বিষয়ে একটি ধারণা হলো, উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করা হবে এবং সেই ব্যক্তি উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত করে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও এসেছে। একইভাবে অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, এসব প্রস্তাব এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করে কমিটির প্রতিবেদনে বিকল্পগুলো তুলে ধরা হবে।

উচ্চকক্ষের স্পিকার কি নিরপেক্ষ হবেন?

নতুন প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে। সংসদের স্পিকার বা উচ্চকক্ষের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হন, তাহলে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হলে এ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য পূরণ নাও হতে পারে। কারণ, স্পিকার নিজেই রাজনৈতিক ব্যক্তি হবেন এবং এতে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।

তাঁর মতে, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নির্দলীয় হওয়া প্রয়োজন এবং তা অবশ্যই রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠন করতে হবে। জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো জরুরি। তা না হলে দেশ আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

জুলাই সনদে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি

জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য একটি সংসদীয় বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি।

কমিটি গঠনের পর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নাম আহ্বান করবে। রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একজন করে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। কমিটি নিজ উদ্যোগেও যোগ্য ব্যক্তিদের নাম খুঁজে বের করতে পারবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নাম পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোচনা করে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। প্রথম ধাপে ঐকমত্য না হলে সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রস্তাবিত নাম নিয়ে পরবর্তী ধাপে আলোচনা হবে। এরপরও সমাধান না এলে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধিকে যুক্ত করে সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে র‌্যাঙ্কড চয়েজ পদ্ধতিতে একজনকে বেছে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এ পর্যায়েই রাজনৈতিক মতভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে বাছাইয়ের শেষ ধাপে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি এবং র‌্যাঙ্কড চয়েজ পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নাম প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল’ কথাটির পরিবর্তে শুধু ‘রাজনৈতিক দল’ রাখার পক্ষে মত দিয়েছে।

জুলাই সনদে আরও বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া বা অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।

কেন রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে বাইরে রাখার আলোচনা

অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া থেকে রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে দূরে রাখার পক্ষে মত এসেছিল।

বিশেষ করে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছিল, পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছিল। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণহানির পর পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। পরে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়।

এই অভিজ্ঞতার কারণে নতুন কাঠামোতে এমন একটি পদ্ধতি তৈরির প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় এসেছে, যাতে কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ না পায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ইতিহাস

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও তখন সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল না। রাজনৈতিক আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।

সেই বিধান অনুযায়ী, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার কথা ছিল। তিনি দায়িত্ব নিতে না চাইলে বা তাঁকে পাওয়া না গেলে বিকল্প হিসেবে আগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং পরে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বিবেচনায় নেওয়ার বিধান ছিল। এসব বিকল্পেও সমাধান না হলে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একজনকে নিয়োগ দিতে পারতেন। সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারতেন।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের রায় অনুযায়ী, ব্যবস্থাটি ভবিষ্যৎ নির্বাচন থেকে কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

রাজনৈতিক ঐকমত্যই বড় চ্যালেঞ্জ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্য দূর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদীয় বাছাই কমিটি, উচ্চকক্ষের স্পিকার কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্ট—যে পদ্ধতিই বিবেচনা করা হোক, তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর।

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ আগেই জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, সে বিষয়ে তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি এমন একটি পদ্ধতিতে একমত হতে পারবে, যেখানে সরকারপ্রধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে নির্বাচনের আগে বা পরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হবে না? নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এই প্রশ্নের সমাধান জরুরি।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: