বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে পরিবহণ খাত থেকে

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হচ্ছে। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, তুলা, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল

2026-10-27T12:06:59+00:00
2026-10-27T13:37:16+00:00
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে পরিবহণ খাত থেকে
দেশীয় নৌবহর বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
সুমন হাওলাদার
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম  আপডেট: ২৭.১০.২০২৬ ১:৩৭ পিএম
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হচ্ছে। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, তুলা, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। এসব পণ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে দেশে প্রবেশ করে। কিন্তু আমদানি পণ্য পরিবহণের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দেশের ব্যবসায়ীদের। এসব জাহাজের ভাড়া বাবদ ব্যয় হওয়া ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে দেশীয় জাহাজ মালিকরা পাচ্ছেন মাত্র ১ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার। বাকি পুরো অর্থ ডলার আকারে চলে যাচ্ছে বিদেশি জাহাজ মালিকদের কাছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষেপ

⚫আমদানি পণ্যের ৮-১০ শতাংশ পরিবহণ করে বাংলাদেশের জাহাজ⚫ফ্ল্যাগ ভেসেল অ্যাক্ট অনুযায়ী আমাদের অবস্থান সামান্য, প্রয়োজন পরিকল্পনা⚫পণ্য খালাসের এনওসি পদ্ধতিতে পরিবর্তন করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৭১.১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৬১ বিলিয়ন থেকে ৬৭.৪৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ছিল প্রায় ৭৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি ছিল প্রায় ৭৭.৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা খাতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩২.৯২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর তথ্য অনুসারে, উন্নত দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনে জিডিপির মাত্র ৬-৮ শতাংশ ব্যয় হলেও বাংলাদেশে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং যানজটের কারণে এই খরচ অনেক বেশি।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ফ্ল্যাগ ভেসেল অ্যাক্ট অনুযায়ী দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজের মাধ্যমে আমদানি রপ্তানির ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের আইনগত অধিকার রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু আমাদের আমদানি রপ্তানির ১৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্ধেকের ধারে কাছেও নেই পণ্য পরিবহণে আমাদের অবস্থান। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা ১০-১৫ শতাংশ হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের শিপিং করপোরেশন, নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে মাত্র ১২টি জাহাজ রয়েছে। এগুলো দিয়েই চলে পণ্য পরিবহণ। কিন্তু এ বিষয়ে আগামীতে আমরা কি করব এমন কোনো কর্মপরিকল্পনা বা ভিশন আমাদের নেই।

জানা গেছে, মৎস্য কোয়ারেন্টাইন আইন, ২০১৮ এবং মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জীবন্ত মাছ, ফ্রোজেন ফিশ বা মৎস্যজাত পণ্য বাংলাদেশে আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যবাহী জাহাজ বা লট বন্দরে পৌঁছানোর অন্তত ১৫ দিন পূর্বে অনাপত্তি সনদ বা এনওসি এর জন্য আবেদন করতে হয়। একই ভাবে কাস্টমস ও ল্যান্ডিং বিধিমালা (জাহাজ থেকে পণ্য খালাস) অনুযায়ী, কোনো পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর পর বিল অব লেডিং এ নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না থাকলে, সাধারণত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পণ্য খালাস বা আনলোড করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করতে না পারলে কাস্টমসের বিশেষ অনুমতি বা শিপিং এজেন্টের এনওসি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এটিও মুক্ত বাণিজ্যের একটি ব্যারিয়ার হিসেবে দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। মন্ত্রী বলেন, আগামীতে আইনের সংশোধন আনা হবে। এ সমস্যার সমাধান করা হবে।

মার্চেন্ট মেরিন অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘৪০ শতাংশ পণ্য দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহন হবে, ২০ শতাংশ থাকবে বাফার জোনে এবং বাকি ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আওতায় থাকবে। কারণ, গ্লোবাল ওপেন ট্রেডের এই ব্যবস্থায় কোনো দেশই তার পুরো বাণিজ্য নিজেদের জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করতে পারে না; বিদেশি জাহাজকেও সেই সুযোগ দিতে হয়।’

নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১২২ টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ৭ টি এবং বাকিগুলো বেসরকারি। এর মধ্যে ৮৭টি বাল্ক কার্গো পণ্যবাহী, ৫টি ট্যাংকার, ৫টি অয়েল ট্যাংকার, ২টি গ্যাস ক্যারিয়ার এবং ৮টি কনটেইনারবাহী জাহাজ। ২৮টি জাহাজ রয়েছে মেঘনা গ্রুপের, ২৭টি কেএসআরএমের, ১১টি আকিজ গ্রুপের, ৮টি এইচ আর লাইন্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।

চট্টগ্রাম নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘৫০ শতাংশ কার্গো পরিবহনের একটি বিধান রয়েছে। এটা আমাদের অধিকার। জাহাজ শিল্প একটি বড় শিল্প। এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবসা থেকেও আমরা উপকৃত হব। যেমন শিপ ম্যানেজমেন্ট, শিপ সাপ্লাইস এবং অন্যান্য শিপ-সম্পর্কিত কারিগরি সহায়তার সুযোগ তৈরি হবে।’

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমরা যদি আমাদের জাহাজ দিয়ে অর্ধেক পণ্য আনতে পারি তাহলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং আমরা ডলার আয় করতে পারব। আমরা জাহাজ চার্টার দিতে পারছি। আমাদের মেরিন একাডেমিগুলোও রয়েছে। ফলে আমাদের লোকজনের চাকরির অভাব হবে না।’

আঙ্কটার্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোট সমুদ্র বাণিজ্যে ৪০ শতাংশ দেশীয় ভেসেল, ৪০ শতাংশ বিদেশি ভেসেল এবং বাকি ২০ শতাংশ যৌথ মালিকানাধীন ভেসেল পরিবহন করতে পারবে।

শিপিং খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে পণ্য পরিবহণের জন্য অন্তত ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। অথচ দেশীয় জাহাজ এই পরিবহণ ব্যবসার মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ বহন করতে পারে। বাকি বড় অংশের আয় বিদেশি জাহাজ ও আন্তর্জাতিক পরিবহণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের (সিএসআর) এক আলোচনা সভায় ৯ বিলিয়ন ডলারের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছিল ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ৮৯ শতাংশ পরিবহণ করেছে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ। একই সময়ে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ৮৪ শতাংশও পরিবহণ করেছে বিদেশি জাহাজ।

এত বড় আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে জাহাজ, বন্দর, কনটেইনার, পণ্য খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহণের ব্যবসা জড়িত। বিদেশ থেকে পণ্য কিনতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার পাশাপাশি পণ্য পরিবহণের জন্যও অর্থ দিতে হয়। দেশীয় জাহাজের অংশ বাড়ানো গেলে এ খাতে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা দেশে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, দেশীয় পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানো জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশীয় জাহাজের অংশ বাড়লে জাহাজ ভাড়া ও পরিবহণ ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ কমানো সম্ভব হতে পারে। সরকার নতুন জাহাজে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, জাহাজ মালিকদের নীতিগত সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশীয় জাহাজের অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: