জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাচ্ছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সফরটি ঘিরে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং জাপানি ঋণের সুদের হার হ্রাসের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন—
ডা. জুবাইদা রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
রেহান আসিফ আসাদ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা
আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান
মো. শাকিরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরাও সফরে অংশ নেবেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ অক্টোবর টোকিও পৌঁছাবেন। পরদিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ ঘোষণা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশের চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় কমানো এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে। বিশেষ করে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলমান প্রকল্প শেষ করার বিষয়েও দুই পক্ষের আলোচনা প্রত্যাশিত।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, মৎস্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। সফরকালে এসব খাতে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক বা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে বাংলাদেশের জন্য বড় অঙ্কের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনার খবরও সামনে এসেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২২ অক্টোবর জানিয়েছে, জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬.৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে জাপানের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিনিয়োগের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে গাড়ি ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্প এবং জ্বালানি অবকাঠামো। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তারা এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে এটিকে চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সম্ভাব্য কর্মসূচিতে রয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা।
এ ছাড়া চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, টোকিওতে পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়ার টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। এসব বৈঠক ও পরিদর্শনে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা গুরুত্ব পাবে।
সফরের অংশ হিসেবে টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপানের সঙ্গে এই সফরে কী ধরনের চুক্তি, বিনিয়োগ-আগ্রহ বা সহযোগিতার ঘোষণা আসে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। বিশেষ করে অবকাঠামো ব্যয় কমানো, রপ্তানি বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সফরের আলোচনা কতটা বাস্তব অগ্রগতি আনে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।