রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতার হাতে পৌঁছাতেই লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম, যার মূলে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য। মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়ার মতো দেশের প্রধান প্রধান কৃষি অঞ্চল থেকে শাকসবজি ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই হাতবদল হচ্ছে অন্তত তিন থেকে চারবার। খেত থেকে তোলার পর স্থানীয় ফড়িয়া, আড়তের দালাল, ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী এবং সবশেষে খুচরা বিক্রেতা—এই দীর্ঘ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে অপ্রয়োজনীয় মুনাফা যোগ হচ্ছে। ফলে মাঠে কৃষক যে লাউ বিক্রি করছেন ১২ থেকে ১৫ টাকায়, রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই তা কিনতে ক্রেতার পকেট থেকে খসছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। একইভাবে ২৫ টাকার ঢেঁড়স খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় এবং ৩২ টাকার ফুলকপি বিকোচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। টমেটো, বেগুন, শিম ও কাঁচা মরিচের দামেও কেজিপ্রতি পাইকারি থেকে খুচরায় ৩০ থেকে ৬০ টাকার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। একদিকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলানো প্রান্তিক কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের পকেট ভারী করে চরম নাভিশ্বাসে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
হাতবদলের এই দৌরাত্ম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খাতের অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়বৃদ্ধি ও বিভিন্ন পয়েন্টের চাঁদাবাজি বা অতিরিক্ত টোল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। উদাহরণস্বরূপ, বগুড়া থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া আগে যেখানে ছিল ১৫ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায়। পরিবহন খরচের এই বর্ধিত হারের চেয়েও বহুগুণ বেশি দাম বাড়ানো হচ্ছে ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে। কাওরানবাজার,যাত্রাবাড়ির মতো বড় পাইকারি বাজারে ৫ কেজির প্রতি পাল্লা বেগুন ৩০০ টাকা (কেজি ৬০ টাকা) কিংবা কাঁচা মরিচ ৩২০ টাকায় (কেজি ৬৪ টাকা) হাতবদল হলেও, খুচরা বাজারে পৌঁছাতেই তা দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে ঠেকছে। পাইকারি আড়তদারদের অভিযোগ, সামান্য পুঁজি খাটিয়ে কোনো রকম ঝুঁকি ছাড়াই বড় অংকের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রেতারা, যা পুরো বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের দায় এড়াতে পচনশীল পণ্যের ক্ষতি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের অজুহাত তুলে ধরছেন। দয়াগঞ্জ কাঁচাবাজারের খুচরা বিক্রেতা রমজান আলীর দাবি, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কেনা ছাড়াও পরিবহন ও বিকালের মধ্যে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি মাথায় রেখে তাদের দাম নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, শীতকালীন আগাম সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও কেবল বাজার মনিটরিংয়ের অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নৈরাজ্যের কারণেই সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। কৃষক ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছে না, অথচ ভোক্তাকে চড়া মূল্য গুণতে হচ্ছে— সরবরাহ শৃঙ্খলের এই চরম বিশৃঙ্খলা দূর করতে সরাসরি কৃষক-টু-বাজার ব্যবস্থা চালু করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর কঠোর নজরদারির তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।