চলতি অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট দিয়েছে সরকার। গত বছরের তুলনায় এক লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। তাই দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নতুন ঋণ পেতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। শুধু বিশ্বব্যাংকের কাছেই বাংলাদেশের প্রত্যাশিত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। এরই মধ্যে ঋণ পেতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর সময়সীমা সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে আট মাসে আনার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। এসব ঋণের শর্ত হিসেবে আইএমএফের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশেরও ইতিবাচক সায় রয়েছে।
জানা গেছে, বাজেটের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে চলতি অর্থবছরেই পাইপলাইনে থাকা পৌনে তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেতে চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগও রয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাংক বা বিদেশি ঋণের ওপরই সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখছে সরকার। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং আইএমএফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য যত বহুপক্ষীয় সংস্থা আছে, এমনকি দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েও সবার সঙ্গে কাজ করব। পর্যায়ক্রমে স্টোকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকও করা হচ্ছে। সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব। সবার সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে, সবাই সহযোগিতা করছে এবং আমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৬—২৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে আসন্ন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে আরো ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব খাত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘এত বড় বাজেট করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে। যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বদলে সংকোচন ঘটাতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার দেওয়া তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি খাতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্যনিরাপত্তায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সহায়তা রয়েছে। এছাড়া ঢাকার চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং দূষণ রোধে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাকি অর্থ পেতে প্রকল্প তৈরি করছে ইআরডি। এর বাইরে চলতি অর্থবছরেই আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণও হিসাবে যোগ করতে চায় বাংলাদেশ। গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঋণের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয় থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও। নতুন প্রস্তাবনায় রয়েছে, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৪ বিলিয়ন ডলার, প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্য সহজীকরণ ও কর্মসংস্থানে দেড় বিলিয়ন ডলার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কারে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনীতির টেকসই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও দেড় বিলিয়ন ডলার। এসব ঋণের লক্ষ্যে আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ করছে ইআরডি।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যে কর্মসূচি নিয়ে আমরা এগিয়েছি, সেখানে কঠিন শর্তের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন শর্তটি কঠিন, তা পরিষ্কার করা হয়নি। পুরোনো কর্মসূচি চলতে থাকলে সেখানে রাজস্ব খাতে ভ্যাটের হার একীভূত করা, কর অব্যাহতি কমানো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠনের মতো বড় সংস্কার ছিল। এগুলো সরাসরি আইএমএফের শর্ত না হলেও আগামীতে নতুন ঋণের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে।