জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আগামী সোমবার টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই উচ্চপর্যায়ের সফরে দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একইসাথে জাপানি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, ঋনে সুদের হার কমানো, দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, জাপানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান এবং চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দিবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। পাশাপাশি বিভিন্ন সেক্টরে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখছে সরকার।
ইতোমধ্যে জাপান আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩৬ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাপানি গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া। অটোমোবাইল, ম্যানুফ্যাকচারিং ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে এই বিনিয়োগ হতে পারে বলে গণমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে। তারা আরও জানিয়েছে, জাপানি ট্রেডিং কোম্পানি সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্যান্য অংশীদারদের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ বিভিন্ন কোম্পানির প্রবেশও এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য সম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন— এমন আটটি বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। তবে আলোচনা শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি দলিল সই হবে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, আমরা আশা করছি, সফরকালে এসব সমঝোতা স্মারকের অনেকগুলোই সই হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা ভোরের ডাককে বলেছেন, এগুলোর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সফর শেষে কৌশলগত অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেওয়ার অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে।
একইসঙ্গে জাপানের ঋণে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫), হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ চলমান বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার আলোচনা থাকবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কম সুদে অতিরিক্ত ঋণ ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় তোলা হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক পর্যালোচনার পাশাপাশি দুই দেশের শীর্ষ নেতা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিরসন এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে যৌথ কূটনৈতিক প্রয়াস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
সফরে কর্মসূচি : সরকারের ঘোষিত সফরসূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধান নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবং জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অংশ নেবেন।
অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়াতে সফরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
জাপানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও যৌথ উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করতে সফরসূচিতে শিল্প ও অবকাঠামো পরিদর্শনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চিবা অঞ্চলের ফুৎসু সিটিতে অবস্থিত একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিক্লো কোম্পানির হেডকোয়ার্টার্স এবং নাগোয়া শহরের টয়োটা গাড়ি তৈরির কারখানা ঘুরে দেখবেন।
আগামী সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা জাপান গমন করবেন। প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপানের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। তারেক রহমানের এই সফর ২ দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে অবদান রাখবে।