দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় বাঁওড় খনন, মাছের অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, পোনা উৎপাদন অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার নির্বাচিত বাঁওড়গুলোতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যক্রম এখনো মূল্যায়নাধীন। পরিকল্পনা কমিশনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের আওতায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাঁওড়ের নির্বাচিত অংশ খনন করে গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান ৩৫টি পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পানি সরবরাহের জন্য ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাঁওড় ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রসারণসেবার অবকাঠামো উন্নয়নে জরাজীর্ণ ছয়টি বাঁওড় ব্যবস্থাপকের অফিস ভবন পুনর্নির্মাণে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং রুইজাতীয় ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্তকরণে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
বিল নার্সারিতে পোনা লালন-পালন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পের সরঞ্জাম খাতে আট লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, চারটি প্রিন্টার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এ জন্য নির্বাচিত জলাশয়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, মাছের নিরাপত্তায় নজরদারি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অভয়াশ্রমের নির্ধারিত এলাকায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যাতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে স্থানীয় জেলেরা মাছ আহরণ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, এটি একটি সমাজভিত্তিক মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে বাঁওড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। অনেক বাঁওড় অগভীর হয়ে যাওয়ায় মাছের বসবাস ও উৎপাদনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে জলাশয়ের উন্নয়ন এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা হালনাগাদ করা প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর সদস্যতালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অন্তর্ভুক্তি, তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাছ আহরণের সুফল সুষমভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের ব্যয়, অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা, সরঞ্জামের ধরন ও দাম এবং জনবল কাঠামোর যৌক্তিকতা মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব পর্যালোচনার পরই প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাঁওড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জেলেদের আয় ও জীবিকার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জিত হলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এর সুফল অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।