সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কিংবা পরে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। এমনকি কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের যে তালিকা কনস্যুলেট সংগ্রহ করেছিল, সেখানেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের কোনো তথ্য ছিল না।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার। তাঁদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে ১৮ অক্টোবর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি গোপনীয় চিঠিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পৃথক অভিযোগে আটক ছিলেন দুজন
কনস্যুলেটের চিঠি অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের তথ্য চেয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর একটি তালিকা পায় কনস্যুলেট। সেই তালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কী সাজা ঘোষণা করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না।
তালিকা অনুযায়ী, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার। নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি ছিলেন জেদ্দার নারী কারাগারে।
তাঁরা দুজনই সৌদি আরবের আল মাজাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে কনস্যুলেটের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে মসজিদের পবিত্রতা ও মর্যাদা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
তবে আটক হওয়ার সময় তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা নথিতে উল্লেখ ছিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে প্রকাশিত বিবরণে তার পরিবর্তে মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠে আসে। মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি ও আদালতের রায় হাতে না পাওয়ায় অভিযোগগুলোর মধ্যে এই পার্থক্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো জানা যায়নি।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই দুই বাংলাদেশির পরিচয় ও মামলার বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করেনি। তাঁদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কোন ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ও এখনো স্পষ্ট নয়।
আগে এমন মৃত্যুদণ্ডের নজির নেই
কনস্যুলেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড হওয়ার নজির তাদের জানা নেই। ফলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ জরুরি হয়ে উঠেছে।
একই নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে নৈতিকতাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। সাজাগুলোর মেয়াদ এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত।
তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে আটক বাকি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তাঁদের মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পরিবার থেকে আইনি সহায়তার আবেদন আসেনি
কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার জন্য কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। তাঁদের বিষয়ে কনস্যুলেটের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগও হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা কিংবা তা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি।
রায়ের কপি চেয়ে সৌদিকে চিঠি
ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে জেদ্দা কনস্যুলেট। ওই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের কপি, মামলার বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়া হয়েছে।
এদিকে, ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে এ ঘটনায় বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
কনস্যুলেটের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে। ফলে দুই বাংলাদেশির মামলার প্রকৃত বিবরণ, মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানতে এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।