একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ, তার উপর কয়েক দফা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে সংসার খরচ সামাল দেওয়া অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় দিয়ে আর সংসারের খরচ মেটাতে পারছে না দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার। খরচ মেটাতে না পেরে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছেন বহু মানুষ। বর্তমানে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। শহরের তুলনায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ। ফলে দেশে সংসার চালানোর চাপ দিন দিন বাড়ছে।
জানা যায়, দেশের সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। আয় বাড়েনি, অথচ নানা কারণে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। মূলত, মানুষের আয় এক জায়গায় আটকে আছে কিন্তু খাদ্য, বাসা ভাড়া, গ্যাস, যাতায়াত, শিক্ষা—সব খরচ একসঙ্গে বেড়েছে। তাই মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষকে সংসার চালাতে সঞ্চয়ে হাত দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি শহর থেকে গ্রাম সব পর্যায়েই পড়েছে। গ্রামের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার গরু-ছাগল বিক্রি করছে সংসারের খরচ মেটাতে। আবার গ্রাম থেকে শহর সব পর্যায়ের অনেক পরিবারকে ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির পর থেকে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামে আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ায় পরিবারগুলোকে বেশি ঋণ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রবাস আয় থেকেও সীমিতসংখ্যক মানুষ বেশি উপকৃত হচ্ছেন। বিবিএসের মজুরি সূচক অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে শ্রমের চাহিদায় ঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে অনুযায়ী, দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও জ্বালানি সংকটকে অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তথ্যে দেখা যায়, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ। ফলে দেশের প্রতিটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি থাকছে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারপ্রতি মাসিক গড় ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। শহরাঞ্চলে তা ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেকোনো পরিবারকে তাদের অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলেই অনুমেয় উত্তরটি পাওয়া যাবে, আয় কমছে কিন্তু খরচ বাড়ছে। ফলে অনেকের সামনেই ঋণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না।’ তিনি বলেন, জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে ব্যয় বাড়ছে না। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। গ্রামে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকায় সেখানকার পরিবারগুলো বেশি চাপে রয়েছে।
বাজারে দিনের পর দিন জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকায় খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলেছেন নিম্নআয়ের মানুষ। তারা কম খাচ্ছেন। রাজধানীর কাজীপাড়া এলাকায় দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন মিলি আক্তার। তিনি বলেন, গরু-খাসির মাংস অনেক আগেই কেনা বাদ দিয়েছি। এখন ডিম-দুধও খাওয়া যাচ্ছে না। গত মাসে ছেলের একটা টিউশনি কমিয়ে দিয়েছি। এভাবে আরও কয়েকমাস চললে যে বাসায় থাকছি, সেটাও ছাড়তে হবে। কম ভাড়ার বাসা খুঁজতে হবে। তিনি বলেন, মেয়েটা বাড়তি আয়ের জন্য টিউশনি শুরু করেছে। তারপরও সংসার চলছে না। প্রায়ই অসুস্থ হই। সবশেষ যে বার অসুখে পড়েছিলাম, তখন গ্রাম থেকে টাকা ধার করে চিকিৎসা করিয়েছি। দ্রব্যমূল্য বাড়ায় প্রতি মাসে খরচ ৫-৭ হাজার টাকা বেড়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করবো কীভাবে।
সরকারি জরিপ অনুয়ায়ী, গত ছয়মাসে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার মাংস খাওয়া কমিয়েছেন। ৮৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার মাছ কম খাচ্ছে। নিম্নআয়ের পরিবারে খরচ বেড়েছে গড়ে ১৩ শতাংশ। এ সময় তাদের আয় বাড়েনি। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার খাবারের গুণগত মানেও ছাড় দিচ্ছে। অর্থাৎ আগের চেয়ে কম দামের খাবার কিনে খাচ্ছে। সারাদিন না খেয়ে থাকছেন- এমন দরিদ্র মানুষের হার ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মান্থলি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর- এই ৮ মাসে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা সঞ্চয় তুলে নিয়েছে মানুষ। অর্থাৎ এই সময়ে মানুষ ব্যাংকে যত টাকা জমা দিয়েছে, তার চেয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেশি তুলে নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম আকাশ বলেন, অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলে ডিস-সেভিং বা ঋণাত্মক সঞ্চয়। মানুষ যখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা দিয়ে বর্তমানের চাল-ডাল কেনে, তখন বুঝতে হবে পরিবারটি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দ্বারপ্রান্তে। সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানোর পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ— আয় বাড়েনি অথচ ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ।