রাজধানীসহ সারাদেশের অনেক সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের পর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত টেকসই থাকছে না। এর অন্যতম কারণ সংস্কারের ইট,পিচসহ যেসব বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে তারই সবই নিম্মমানের। তাছাড়া, প্রতি বর্ষায় সড়কগুলো ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ছোট গর্ত তৈরি হলেও পর্যায়ক্রমে তা বড় আকার ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে যান চলাচলও হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজের গুণগত মান স্থায়িত্ব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর হচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সড়কের তিন বছরের ওয়ারেন্টি হিসেবে জামানত গ্রহণের আওতায় আনাসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে বন্ধ হবে বারবার সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ। কমবে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়।
দেশের সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ এবং সংস্কারকাজে গুণগত মান ঠিক না থাকায় দ্রুত সড়ক ভেঙ্গে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। নির্ধারিত মান বজায় রেখে সড়ক নির্মাণ, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের তদারকি জোরদার, উপকরণের মান পরীক্ষা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে : রাজধানীসহ সারাদেশের আঞ্চলিক ও মহাসড়ক সংস্কার করার কিছু দিন পরই ভেঙ্গে যেতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্ষায় কোথাও সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার পিচ উঠে যাচ্ছে। ফলে একই সড়কে বারবার সংস্কার করতে হচ্ছে। এতে সরকারের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি যান চলাচলে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় সড়ক নির্মাণও সংস্কারে নতুন এই উদ্যোগ আশার আলো দেখাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে : প্রতি বছর সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কে খানাখন্দ তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দেখা দেয় ফাটল, উঠে যায় পিচের আস্তরণ, আবার বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। এতে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ। পাশাপাশি একই সড়ক বারবার মেরামত করতে গিয়ে সরকারি অর্থের ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। ফলে এর সাথে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে সড়ক নির্মাণের পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিন বছরের ওয়ারেন্টি ব্যবস্থার আওতায় নির্মাণকাজে ত্রুটি দেখা দিলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তা মেরামতের দায়িত্ব ঠিকাদারের ওপর বর্তাবে। ফলে নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সতর্ক হতে হবে। এ ব্যবস্থায় জামানত গ্রহণ ও সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত জামানত রাখা হলে ওয়ারেন্টির মেয়াদে সড়কের ত্রুটি সংশোধনে ঠিকাদারকে দায়বদ্ধ করা সহজ হতে পারে। তবে জামানতের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের শর্ত এবং ত্রুটি সংশোধনের পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও চুক্তির বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। আর সড়ক নির্মাণে গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে, অন্যদিকে কমবে বারবার মেরামতের ব্যয়। বাড়বে সড়ক যোগাযোগের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা, যার সুফল পাবেন সাধারণ মানুষ।
রাবারাইজড বিটুমিন ব্যবহারের পরামর্শ : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সড়কে যেসব বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিম্মমানের থাকায় দ্রুত সড়ক ভেঙ্গে যাচ্ছে। ফলে রাবারাইজড বিটুমিন ব্যবহারে এ সংকট দূর হতে পারে। কারণ সড়ক তাপমাত্রার পরিবর্তন ও যানবাহনের চাপ তুলনামূলকভাবে এটি ভালোভাবে সহ্য করতে পারে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ও কিছু ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব হতে পারে। ফলে সড়কের আয়ু বাড়লে ঘন ঘন সংস্কারের প্রয়োজন কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রাবারাইজড বিটুমিন ব্যবহারের পাশাপাশি সড়কের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, নির্মাণকাজে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বর্ষায় সড়ক নষ্ট হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। এতে একদিকে জনগণের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে প্রতিবছর সড়ক মেরামতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন যথাযথ গবেষণা, মানসম্মত উপকরণ এবং দক্ষ কারিগরি ব্যবস্থাপনা।
সড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে : সড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে শুধু নির্মাণকাজ শেষ করলেই হবে না। বরং পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই, কাজের তদারকি এবং নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত বিটুমিন, পাথর, বালু ও অন্যান্য উপকরণের মান নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কাজের মান যাচাইয়ে স্বাধীন পরীক্ষা এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নির্ধারিত মানের বাইরে কাজ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও উদ্যোগ নিতে হবে।
ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সড়ক নির্মাণের নকশা তৈরি করতে হবে : বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি নানা কারণে উঠানামা করছে। ফলে এ বিবেচনায় নিয়ে সড়ক নির্মাণের নকশা তৈরি করার উপর জোর দেয়ার আহবান জানিয়েনে বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, কার্যকর ড্রেনেজ, সড়কের ভিত্তি মজবুত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সড়কের আয়ুষ্কাল বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব পাওয়া কঠিন। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল পেতে হলে নীতিমালা ও পরিকল্পনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা, ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রাখা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। এখন দেখার বিষয়, নতুন পরিকল্পনা ও উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সড়ক অবকাঠামোকে কতটা টেকসই ও জনবান্ধব করা যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ : নির্মাণকাজে ত্রুটি দেখা দিলে তা যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কর্তৃক শনাক্ত করা, লিখিতভাবে ঠিকাদারকে জানানো এবং চুক্তি অনুযায়ী মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জামানত ফেরত দেওয়ার আগে ওয়ারেন্টির শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। সড়ক নির্মাণে তিন বছরের ওয়ারেন্টি ও জামানত ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে বারবার মেরামতের ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। স্থাপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সড়ক নির্মাণকাজের গুণগত মান স্থায়িত্ব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়ায় সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে এর মান আগের থেকে ভালো হবে বলে আশা করা যায়। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত কতটা স্পষ্ট, তদারকি কতটা কার্যকর এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে তার ওপর। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ও নিয়মিত মান যাচাইয়ের মাধ্যমে সড়ক নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন বড় লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ, কে, এম, সেলিম রেজা হাবিব, এমপি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, সড়ক ও রাস্তাঘাট নির্মাণকাজের গুণগত মান, স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কমিটির পক্ষ থেকে ঠিকাদারদের কাছ থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি হিসেবে জামানত গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে নির্মাণকাজের তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে বারবার সড়ক সংস্কারে যে অর্থের অপচয় হচ্ছে তা বন্ধ হবে এবং সড়কের স্থায়িত্বও বাড়বে।