পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ভৌত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর কেন্দ্রটির ‘পাওয়ার স্টার্ট’ বা সি-স্টেজের কাজ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এ ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রটির নিরাপদ ও স্থিতিশীল কার্যক্রম যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে এ অনুমোদন দেওয়া হয় বলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে গত ১১ অক্টোবর পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ভৌত পরীক্ষা চালিয়ে চুল্লির কার্যক্রম ও উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে পাওয়ার স্টার্ট বা সি-স্টেজের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ পর্যায়েও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে।
প্রথমে খুব কম মাত্রায় শক্তি উৎপাদন শুরু করে ধাপে ধাপে তা বাড়ানো হবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। এ পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ কার্যক্রম আগামী ডিসেম্বরে শুরু হতে পারে।
সি-স্টেজে চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পর্যায়ে কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরে শুরুর কথা ছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরুর আগে বায়েরার অনুমোদন নিতে হয়। ভৌত পরীক্ষা এবং পরবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে চুল্লি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির আচরণ এবং কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পারমাণবিক জ্বালানির বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্পের চাপে ঘুরবে টারবাইন। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার পরও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে সাত থেকে আট মাস। এ সময় বিভিন্ন ধাপে কেন্দ্রের নিরাপত্তা, উৎপাদনক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা যাচাই করা হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় একক উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রকল্পটির পরিচালন কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে এনপিসিবিএল। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হবে। তবে বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে কেন্দ্রটিকে আরও কয়েকটি পরীক্ষা ও অনুমোদনের ধাপ অতিক্রম করতে হবে।