মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আশঙ্কা, সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষতি অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক—অক্টোবর ২০২৬ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে, যা ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সময়ে ধাতু, খাদ্যপণ্য, সার ও মূল্যবান ধাতুর দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১ ডলার হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ দাম প্রায় ৯২ ডলার বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্রেন্টের গড় দাম ছিল ৬৯ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে তেলের গড় দামে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফনের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় বাদ দিলে গত চার দশকের মধ্যে এটি হবে সরবরাহ হ্রাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। অন্যদিকে, উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে তেলের বৈশ্বিক ব্যবহারও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ ও ১৯৮০ সালের পর এটি হবে বার্ষিক ব্যবহারে তৃতীয় বৃহত্তম পতন।
সরবরাহ ও চাহিদার এই পরিবর্তন সত্ত্বেও তেলের মজুত কমে যাওয়ায় বাজার নতুন সংকটের প্রতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষতি চলতে থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যবাজারেও পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়লে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে প্রায় ১৮ শতাংশ।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও সারের বাড়তি ব্যয় এবং প্রতিকূল আবহাওয়া খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ তৈরি করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্যব্যয়ও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে তীব্র এল নিনো পরিস্থিতির আশঙ্কা এবং অন্যান্য ঝুঁকি একসঙ্গে দেখা দিলে খাদ্যসংকট আরও গভীর হতে পারে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম মূল পূর্বাভাসের তুলনায় আরও ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। এর ফলে বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সারের দাম ২০২৬ সালে ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বছরের শুরুতে ইউরিয়ার দাম বেড়ে যাওয়ার পর কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে সারবাজারে ব্যয়ের চাপ রয়ে গেছে। ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারের দাম বৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয় যুক্ত হলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কৃষিপণ্যের বাজারদর এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। এতে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর দাম এ বছর ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে এসব ধাতুর দাম কিছুটা কমলেও তা ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের গড়ের তুলনায় তিন গুণের বেশি থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
শিল্পে ব্যবহৃত ধাতুর দাম বাড়লে অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও প্রযুক্তি খাতের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
চলতি বছর পণ্যমূল্য ব্যাপকভাবে বাড়লেও ২০২৭ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে সংঘাতের তীব্রতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার পরিস্থিতির ওপর।
সংস্থাটির হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে, রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষতি অব্যাহত থাকলে, কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এবং তীব্র এল নিনো একসঙ্গে দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। খাদ্যপণ্যের দামও মূল পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোসে বলেন, পণ্যের বাজার একসঙ্গে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ও বাণিজ্যে বিঘ্ন নানা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ বাড়তে পারে। তিনি সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে ইতিমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলারের স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক গ্রুপ জানিয়েছে, বিদ্যমান বিভিন্ন অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশগুলোকে সহায়তা করতে ৫০০০ কোটি থেকে ৬০০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০০ কোটি ডলারের পূর্বনির্ধারিত অর্থায়ন রয়েছে। এ সহায়তা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ক্ষুদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষি খাতের তারল্য সংকট মোকাবিলায় কাজে লাগানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একইভাবে সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের বাজারদরে চাপ পড়তে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে গম, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই বাংলাদেশে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে, এমন নয়। বিনিময় হার, আমদানি নীতি, সরকারি শুল্ক, মজুত, স্থানীয় উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপরও দেশের বাজারদর নির্ভর করবে।
বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস তাই শুধু আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের সম্ভাব্য পরিবর্তন নয়; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, জ্বালানি ব্যয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।