রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা বা ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এখন থেকে নিবন্ধন ছাড়া এসব যান সড়কে চালানো যাবে না। নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচল, অতিরিক্ত যাত্রী বহন কিংবা নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চালালে নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা। সাধারণ সড়কে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার এবং স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে হবে এসব যানকে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রকাশিত গেজেটের বিধান অনুযায়ী, এটি দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্যকর হবে।
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার নিবন্ধন, চালকের যোগ্যতা, চলাচলের রুট, গতিসীমা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, পার্কিং, ব্যাটারি চার্জিং, পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কোন সড়কে চলবে, কোথায় সম্পূর্ণ নিষেধ?
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা চলাচলের রুট নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে। এ ক্ষেত্রে এলাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করা হবে। প্রতিটি জোনে কতটি ই-রিকশা চলবে, কোন সড়ক ব্যবহার করবে এবং কোন রঙের ই-রিকশা চলবে, তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না। ফলে রাজধানীর সব অলিগলি কিংবা সব সড়কে ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কোন এলাকায় কোন রুট অনুমোদিত হবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
যেসব সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে না, সেগুলো হলো—
⏺ জাতীয় মহাসড়ক।
⏺ এক্সপ্রেসওয়ে ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
⏺ প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোর।
⏺ প্রশাসন কর্তৃক সময় সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়ক।
⏺ ফুটপাত।
এ ছাড়া ই-রিকশা চালানোর সময় চালককে সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় মুঠোফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তন করা যাবে না।
সর্বোচ্চ গতি ২৫, বিশেষ এলাকায় ১৫ কিলোমিটার
ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চালানো যাবে না।
প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার ও ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ই-রিকশার আকার ও অনুমোদিত আসনসংখ্যা অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। এর বেশি যাত্রী নেওয়ার সুযোগ নেই। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
এক এনআইডিতে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে।
নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।
আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশাকে কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর ও নম্বরপ্লেট দেওয়া হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
নিবন্ধন ও নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে—
⏺ দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা।
⏺ চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা।
এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।
চালক হতে হবে কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী
ই-রিকশা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে চালককে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। বিধিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করলে নিবন্ধন পাওয়া যাবে না।
কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।
পুরোনো রিকশার কী হবে?
বর্তমানে রাস্তায় চলাচল করা ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোও নতুন বিধিমালার বাইরে থাকছে না। এসব যানকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। নির্ধারিত মান পূরণ না করলে কোনো ই-রিকশা নিবন্ধন বা নবায়নের সুযোগ পাবে না।
প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফটাইম) নির্ধারণ করা হয়েছে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এ সময় শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট বাতিল করতে হবে।
পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।
যেখানে-সেখানে চার্জ দেওয়া যাবে না
নতুন বিধিমালায় ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট অথবা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করতে হবে।
চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। এসব কেন্দ্রে সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিড বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।
অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুরোনো ব্যাটারি ফেললে পড়তে হবে বিপদে
পরিবেশদূষণ রোধে পুরোনো ও অকার্যকর ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায়ও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরোনো ব্যাটারি কিংবা এর অংশবিশেষ উন্মুক্ত স্থানে, মাটিতে, জলাশয়ে বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলতে পারবে না। এমনকি ব্যাটারি পোড়ানোও নিষিদ্ধ।
নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করতে হবে। পরে সেগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজও করা যাবে না।
কোন কোন অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
বিধিমালায় বেশ কয়েকটি কাজকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
⏺ নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো।
⏺ নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা।
⏺ অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা।
⏺ অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার করা।
⏺ মোটর বা গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন করা।
⏺ নিষিদ্ধ সড়ক বা এলাকায় চলাচল করা।
⏺ বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো।
⏺ ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা।
⏺ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া।
এসব অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ ই-রিকশা চলাচল বন্ধে ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।
দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় অবহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সাধারণ ডায়েরি ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
ই-রিকশা তৈরিতেও লাগবে সরকারি অনুমোদন
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নকশা, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি সুপারিশ কমিটি থাকবে।
এ কমিটিতে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, বুয়েট ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। কমিটির সুপারিশ ও সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন লাইসেন্স দেওয়া হবে।
এ ছাড়া অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে চালক ও মালিকদের ঋণসহায়তা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান নতুন বিধিমালাকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক ই-রিকশাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকায় প্রান্তিক চালকদের পরিবর্তে বড় বিনিয়োগকারীদের হাতে এ খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি মনে করেন, শহরের অলিগলি ও আবাসিক এলাকার সড়ক অনুযায়ী গতিসীমা, রিকশার সংখ্যা এবং চলাচলের নিয়ম আরও সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। চার্জিং ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের সময়সীমা থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার চলাচল থেকে শুরু করে নিবন্ধন, উৎপাদন ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে রাজধানীর কোন সড়কে কতটি রিকশা চলবে, কোন জোনে কী রঙের রিকশা থাকবে এবং পুরোনো রিকশাগুলো কীভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসবে—এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের বাস্তবায়ন সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- এক এনআইডিতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ।
- দুই আসনের জন্য ৮ হাজার এবং চার আসনের জন্য ১০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি।
- বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকা।
- নিবন্ধন পেতে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিধান।
- নিবন্ধনবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ ই-রিকশা বন্ধে ট্রাফিক বিভাগ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা।