
ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আবারও নদীতে মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। তবে নদীতে ফেরার আনন্দের চেয়ে তাদের মনে দুশ্চিন্তাই বেশি। কারণ, দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে কোনো রকমে সংসার চালিয়েছেন তারা। এখন নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না মিললে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিক্রি ও মজুত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে এ কর্মসূচি নেওয়া হলেও এ সময়ে আয় বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েন নদীতীরবর্তী জেলে পরিবারগুলো। অনেকের ঘরে দেখা দেয় খাবারের সংকট। সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে ঋণ করতে হয়েছে অনেককে।
মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকার মেঘনাপাড়ের জেলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, আমরা তা পালন করেছি। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতে ইলিশ শিকার করেছেন বলে শুনেছি। আমরা এখন একবুক আশা নিয়ে নদীতে নামার অপেক্ষায় আছি। আল্লাহ সহায় হলে নদীতে ইলিশ পাব। আর মাছ না পেলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।’
মোহনপুর এলাকার জেলে আকবর বলেন, ‘আমরা শেষ মুহূর্তে জাল সেলাই করছি, নৌকা মেরামত করছি। এখন নদীতে গিয়ে মাছ ধরব। কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত মাছ আছে কি না, তা বুঝতে পারছি না। মাছ না পেলে সংসার চালাব কীভাবে? মহাজনের দেনা, ঘরের খরচ—সব মিলিয়ে আমরা দিশেহারা।’
জেলেরা জানান, চলতি বছর ইলিশের ভরা মৌসুমেও নদীতে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায়নি। মৌসুমের শেষ দিকে এসে নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ না মিললে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। একদিকে নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ, অন্যদিকে সংসারের ব্যয় ও পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ—সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাদের অভিযোগ, এ বছর নদীতে যথেষ্ট জোরালো অভিযান না থাকায় একশ্রেণির জেলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ করেছেন। তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জেলেদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ না পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দামের ওপরই প্রভাব পড়বে না, দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত হাজারো জেলে ও ব্যবসায়ী। তাই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সজিব চন্দ্র দে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মা ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, জেলেরা সচেতন হোন এবং নিষেধাজ্ঞা মেনে চলুন। মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে, যার সুফল জেলেরাই পাবেন।’
মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল আমিন জানান, মা ইলিশ রক্ষায় পরিচালিত অভিযান সফল হয়েছে। অভিযানে ৬ লাখ মিটার জাল ও ১২টি নৌকাসহ মোট ১৩৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় মেঘনার বুকে জাল ফেলতে প্রস্তুত মতলব উত্তরের জেলেরা। তাদের প্রত্যাশা, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে, ঘুচবে অভাব, শোধ হবে ধারদেনা। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করছে নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতার ওপর। আপাতত নদীর দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন তারা—জালভরা ইলিশের আশায়, ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির প্রত্যাশায়।