দেশের রাজনৈতিক ও জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জুলাই সদন বাস্তবায়ন, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দুই দলের পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য, লংমাচ, রাজনৈতিক নানা কর্মসূচি, নীতিনির্ধারণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। এতে ফের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উত্তাপ। ফলে জাতীয় স্বার্থে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দলের একটি অংশ মিলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার দেশের বাইরে থেকে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থ সরবরাহ করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। একদল জনগণকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, অন্যরা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে মিথ্যা বলে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করতে চেয়েছে। এখন দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আরেকটি সমাবেশে বিরোধী দল জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত দল’ যৌথভাবে চক্রান্ত ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। পরাজিত শক্তি ও ওই দলের আচরণ এবং কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনও তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ ছিল একটি অপপ্রচারকারী দল। তাদের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুপ্ত দল। প্রমাণ আছে, তাদের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। তারা নিজেরাই বলেছিল, আওয়ামী লীগকে মাফ করে দেবে। পরাজিত শক্তির আচরণ এবং এই দলটির আচরণ একই রকম। এছাড়া, জুলাই-আগস্টের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা উপস্থিত না হওয়া ও লংমার্চের সমালোচনা করে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা। তাছাড়া, সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাও বিরোধী দলের সমালোচনা করে নানা বক্তব্য দেয়ায় তার সমালোচনা করে পাল্টা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা।
পাল্টা বক্তব্য আব্যাহত রেখেছে বিরোধী দল : ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পথেই বিএনপি সরকার হাঁটছে বলে সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ক্ষমতায় বসে জুলাই সনদ আর গণভোটের গণরায় অস্বীকার করছে সরকার। এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় গত সাত মাসে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে বিএনপি সরকার। দেশের উন্নয়নকাজে এতদিন তাদের সহযোগিতা করার কথা ভেবেছিল বিরোধী দল। কিন্তু বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। বিএনপি বদলে গিয়ে এখন আমাদের নানা অপবাদ দিচ্ছে। কিন্তু আমরা বদলাব না। জুলাই সনদ আর গণভোটের গণরায় আদায় করেই ছাড়ব। অন্যদিকে, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকার প্রধানকে উদ্দেশ করে বলেন, ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছেন আপনার নেটওয়ার্ক। আপনি উত্তরবঙ্গে গিয়ে বলেছেন, পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্যে আপনি তথ্য পেয়েছেন, এর পেছনে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যে গোয়েন্দা বাহিনী, যে গোয়েন্দাগিরি, যে সেটআপ আওয়ামী লীগ রেখে গেছে, যারা নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়েছে, রিমান্ডে, আয়নাঘরে নিয়েছে, সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে আপনি এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাবেন? যে পুলিশ বাহিনীর সেটআপ যারা রেখে গিয়েছিল, সেইসব গোয়েন্দা বাহিনী, সেইসব গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এখনো আপনি সরাননি। গোলাম পরওয়ার বলেন, আপনাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে, দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনারা বলেন অস্থিতিশীলতা। বিরোধী দলের দায়িত্বই তো হচ্ছে সরকারের অপকর্ম জাতির সামনে তুলে ধরা। তাহলে কি কিছুই বলা যাবে না? এটিই তো ফ্যাসিবাদের পথ। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কথার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করে এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য অব্যাহত রেখেছেন। বিরোধী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাও বলছেন, সরকার ক্ষতায় এসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় দেশে নানা সংকট চলছে। এটিকে অন্যদিকে নেয়ার জন্য এখন নানা বিষয় সামনে এনে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। দুই দলের এমন মুখোমুখি অবস্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সারসহ নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট সমাধান নিয়ে দুই দলের মাথা ব্যাথা নেই। অথচ সরকার-বিরোধী দল একে অপরের প্রতি রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। এটা আমাদের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। তবে এসব বিরোধ যদি আলোচনার পরিবর্তে সংঘাতের দিকে এগোয়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনজীবনে তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা : বিগত সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের মারমুখী অবস্থান দেখতে চায় না সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নাগরিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ যেন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন নাগরিকেরা। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দুই পক্ষের রাজনৈতিক কৌশল, আলোচনার উদ্যোগ এবং জাতীয় স্বার্থকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তার ওপর। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান। সম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে মুখোমুখি একটা বিরোধে আমরা আছি। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার নিয়ে। সংবিধান সংস্কার করার কথা ছিল। কিন্তু সরকার সংবিধান সংস্কারের সেই দাবি এবং অঙ্গীকার থেকে সুস্পষ্ট পিছু হটেছে। তারা এখন সংবিধান সংশোধন করার পথে বা বাড়িয়েছে। ফলে এ দাবি আদায়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।