জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে দলের শীর্ষ দুই পদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেনই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দলের দপ্তর সেল সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিনার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে করা হয়েছে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। অন্যদিকে, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দলের প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় কাঠামোয় এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন দায়িত্ব বণ্টনে একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা পরিচিত নেতাদের পদ ও ভূমিকা নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
চার নেতাকে ঘিরে নতুন সমীকরণ
এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন চার নেতার দায়িত্ব পুনর্বণ্টন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহ পেয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব। আগে পাটওয়ারী দলের মুখ্য সমন্বয়ক এবং হাসনাত দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অন্যদিকে, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে। সারজিস আগে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং আসিফ দলের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন।
অর্থাৎ, চার নেতার দায়িত্ব এখন নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে সাজানো হয়েছে। তাঁদের আগের পদগুলোর সঙ্গে নতুন পদবির সরাসরি তুলনা করে দায়িত্বের গুরুত্ব কমেছে বা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দলের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যপরিধি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এর আগে কেন্দ্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা সামনে এলে দলীয় নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন।
সামান্তা শারমিনের পদে পরিবর্তন
পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিনের পদেও পরিবর্তন এসেছে। আগে তিনি সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন, এবার তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। ফলে নতুন কমিটিতে তাঁর পদমর্যাদা আগের তুলনায় এক ধাপ নিচে নেমেছে।
তবে এ পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর পদ পরিবর্তনকে কোনো রাজনৈতিক বিরোধ বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল হিসেবে দেখার মতো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আহ্বায়ক কমিটিতে কারা থাকছেন?
নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, ড. আতিক মুজাহিদ, আব্দুল হান্নান মাসউদ, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহ উদ্দিন সিফাত, ডা. মাহমুদা আলম মিতু, নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক, মাহবুব আলম, অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, মাওলানা আশরাফ মাহাদী, সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া, জাবেদ রাসিন, এহতেশাম হক, দিলশানা পারুল, প্রীতম দাশ, সামান্তা শারমিন, ইসহাক সরকার, তারেক এ আদেল ও এ.কে. ফ্লোরা।
যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, এস.এম. সাইফ মুস্তাফিজ, মো. নিজাম উদ্দিন, নাহিদা সারোয়ার নিভা, ফরিদুল হক ও মো. আতাউল্লাহ।
আন্তর্জাতিক সম্পাদক হয়েছেন তাহসীন রিয়াজ এবং সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক আশরেফা খাতুন। দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাদিয়া ফারজানা দিনা, সহ-দপ্তর সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম। আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, প্রচার সম্পাদক জয়নাল আবেদীন শিশির এবং শিক্ষা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত।
এ ছাড়া পরিবেশ ও জলবায়ু, নারী, সংস্কৃতি, শ্রম, সাহিত্য ও প্রকাশনা, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, গণশিক্ষা, মিডিয়া এবং প্রবাসী কল্যাণসহ বিভিন্ন বিভাগে নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের নামও কমিটির তালিকায় রয়েছে।
জেলা-উপজেলায় সংগঠন বিস্তারের লক্ষ্য
কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তারের পরিকল্পনাও রয়েছে এনসিপির। এর আগে দলটি দেশের ৬৪ জেলায় কমিটি গঠনের পর উপজেলা পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দলীয় নেতারা জানিয়েছিলেন, অক্টোবরের মধ্যে সব উপজেলায় কমিটি গঠনের লক্ষ্য রয়েছে।
নতুন কমিটিতে বিভাগভিত্তিক সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনও সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ডায়াস্পোরা সাংগঠনিক দায়িত্বও রাখা হয়েছে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
নতুন কমিটির সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে তৃণমূল পর্যন্ত কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া, সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
নেতৃত্বে পরিচিত মুখগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলেও কেবল পদ পুনর্বণ্টন দিয়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো সম্ভব হবে না। মাঠপর্যায়ে কমিটি গঠন, কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়, রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে পুনর্গঠনের সাফল্য।
নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের নেতৃত্ব বহাল রেখে নতুন দায়িত্ব বণ্টনের মধ্য দিয়ে এনসিপি এখন সংগঠনকে আরও সুসংহত করার পথে এগোতে চাইছে। তবে পুনর্গঠিত কমিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা বোঝা যাবে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতায়।