ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানায় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না পাওয়া, ফোন ধরতে অনীহা এবং ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে থানার ওসির কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। পরে তাঁদের কথোপকথনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকে রুমিন ফারহানা নেতা-কর্মীদের নিয়ে থানায় যান। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ওসির কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি চলে। এ সময় সংসদ সদস্য ও তাঁর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ওসিকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ওসিও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে থানায় হইচই করে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ তোলেন।
নিরাপত্তা না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ
রুমিন ফারহানা ও তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ভাষ্য, দুর্গাপূজার সময় সংসদীয় আসনের আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর এলাকায় পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে সে ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সরাইল থানার ওসির কাছ থেকে সাড়া পাননি তিনি।
রুমিন ফারহানা গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাকির হোসেন একাধিকবার ফোন করলেও ওসি ফোন ধরেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ বার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও ওসির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে তিনি থানায় যান।
ওসির কক্ষে বসে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে আমাকে পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে কোনো নিরাপত্তা দেয়নি। আমার পিএস ১২ বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। উনি বলেছেন, আমার নিরাপত্তা আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। এখন থেকে ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলব।’
ওসির বিরুদ্ধে ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
থানায় গিয়ে রুমিন ফারহানা ওসির বিরুদ্ধে ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের একটি তালিকা নিয়ে তিনি থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে দুই পাতার একটি তালিকায় অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘নানান অভিযোগ ওনার (ওসি) বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। আমি একটা তালিকাও নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি কোনো মন্তব্যও করেন নাই। দুই পাতার তালিকা ছিল যে এই তারিখে এই অপরাধ, ওই তারিখে ওই অপরাধ। উনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।’
ভিডিওতে তাঁকে ওসির রাজনৈতিক অতীত নিয়েও মন্তব্য করতে শোনা যায়। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। জি স্যার, আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি।’
তবে ওসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই বা প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ওসি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মামলার আসামি ছাড়াতে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুমিন ফারহানার সঙ্গে থানায় যাওয়া এক ব্যক্তি ওসির বিরুদ্ধে একটি মামলার আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ওসি ওই অভিযোগও অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, সংসদ সদস্য ওই ব্যক্তিকে শিখিয়ে নিয়ে এসেছেন।
এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের ফল বা প্রামাণ্য নথি প্রকাশিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি যাচাইসাপেক্ষ।
‘শত শত লোক নিয়ে থানায় হইচই করেছেন’
সংসদ সদস্যের অভিযোগের জবাবে সরাইল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, রুমিন ফারহানা অনেক লোক নিয়ে থানায় এসে তাঁর কক্ষে হইচই করেন এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেন।
ওসি বলেন, ‘সংসদ সদস্য মহোদয় এসেছিলেন। তিনি শত শত লোক নিয়ে থানার মধ্যে হইচই করে একটি অস্থিরতা তৈরি করে আমার কক্ষে। একটা বিব্রতকর অবস্থা।’
নিরাপত্তা না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসির বক্তব্য, দুর্গাপূজা উপলক্ষে পুরো এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশ দল রাখা ভিন্ন বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা পূজাকেন্দ্রিক সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা করেছি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য উনি গানম্যান চাইবেন। সেটা আলাদা বিষয়। একটা দল ওই সময় তাঁর সঙ্গে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল।’
ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পুলিশি সহায়তা বা গানম্যান চাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করার বিষয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওসির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারে চাপ দেওয়ার অভিযোগ
রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার না করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন ওসি। তাঁর দাবি, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে তিনি নোট রেখেছেন।
ওসি বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজনকে গ্রেপ্তার না করার জন্য সংসদ সদস্য তাঁকে চাপ প্রয়োগ করেন এবং তাঁর কাছে এ বিষয়ে তালিকা রয়েছে। তিনি রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে থানায় এসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগও করেন।
অন্যদিকে, রুমিন ফারহানা ওসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং নিরাপত্তা না পাওয়ার বিষয়টিকে তাঁর থানায় যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুই পক্ষের এ বক্তব্যের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা
থানার ওসির কক্ষে কথোপকথনের একাধিক ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশিত ভিডিওগুলোর একটির দৈর্ঘ্য ৭ মিনিট ৮ সেকেন্ড, আরেকটির ৫৭ সেকেন্ড এবং অন্যটির ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওতে সংসদ সদস্য, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে ওসিকে কথা বলতে দেখা যায়।
একপর্যায়ে ওসি পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং কক্ষে উপস্থিত ব্যক্তিদের দেখানোর জন্য ভিডিও কল করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ সময় রুমিন ফারহানা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও ওসি সাড়া দেননি বলে তাঁর অভিযোগ।
ঘটনাটি নিয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।
রুমিন ফারহানা ও ওসির বক্তব্যে স্পষ্ট, বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ। তবে ঘুষ-দুর্নীতি কিংবা ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ—কোনোটিই কেবল পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়া যায় না।