জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিলেও সেই ভোট রক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ তাঁদের জানায়, ভোট দিয়েছিল, কিন্তু জামায়াত তা রক্ষা করতে পারেনি। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে সতর্কভাবে কাজ করতে হবে।
শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভালোবাসা পাওয়া আল্লাহর বড় নিয়ামত। জাতীয় নির্বাচনে কোথায় ভুল হয়েছে এবং কোন জায়গায় দুর্বলতা ছিল, তা চিহ্নিত করা গেছে। ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য আল্লাহর জান্নাত অর্জন করা। যারা দিন আনে দিন খায়, আল্লাহর পথে তাঁদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৭০ শতাংশ মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
রুকনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অতীতে সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংগঠন পরিচালনায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। বর্তমান সময়েও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। আল্লাহ যাঁদের সম্পদ দিয়েছেন, তাঁদের সেই নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং জান্নাতের জন্য নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের সাংগঠনিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দুই মহানগরীর সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল ছিল। নেতা-কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সংগঠন বর্তমান অবস্থানে এসেছে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা থামব না, আমাদের থামার সুযোগ নেই।’ সামনে সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে দিনরাত কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে ভবিষ্যতে ভুল এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সমাজ পরিবর্তনের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা আর বসে থেকে তামাশা দেখবেন না। সংগত কারণে প্রতিবাদ করবেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। তিনি বলেন, দেশ কোরআনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
সম্মেলনে ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন ডা. শফিকুর রহমান। আয়োজকদের দাবি, অ্যাপটিতে নাগরিকদের জন্য ৫০টিরও বেশি সেবামূলক সুবিধা রয়েছে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ-পদবি নয়; এটি একটি মান। একে ক্ষমতা মনে করলে ভুল হবে। নীতি-নৈতিকতার মান বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপন রুকনদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, রুকনদের মান ও রুহানিয়াত যত শক্তিশালী হবে, সংগঠনও তত শক্তিশালী হবে। আগামী মেয়র নির্বাচনে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সাংগঠনিক ভূমিকার মাধ্যমে সফলতা অর্জনে কাজ করতে হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকন সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সদস্যদের মান, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতাও বাড়াতে হবে। আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্মেলনটি নির্বাচনী ও সাংগঠনিক—দুটি অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে ১১টা পর্যন্ত নির্বাচনী অধিবেশনে ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির নির্বাচনে রুকনরা ভোট দেন। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে ১৩ হাজারের বেশি রুকন ভোট প্রদান করেন।
নির্বাচন পরিচালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আ. সবুর ফকির।
সকাল ১১টা থেকে শুরু হয় সাংগঠনিক অধিবেশন। এতে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপিসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী পর্যায়ের নেতারা।