কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিকভাবে সমমনা সাতটি ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ‘সমমনা ইসলামী দলসমূহ’ নামে গঠিত এ জোটের লক্ষ্য ইসলামী মূল্যবোধ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করা। তবে জোটের কয়েকটি দল অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গেও সক্রিয় থাকায় নতুন এই ঐক্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় সাতটি দলের নেতাদের বৈঠকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন জানান, প্রতিটি দলের তিনজন করে মোট ২১ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। জোটের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত হেফাজতের নেতারা তাঁদের সহযোগিতা করবেন।
আতাউল্লাহ আমিন বলেন, হেফাজতে ইসলামের সহযোগিতায় আমরা সাতটি দল সমমনা ইসলামী দলসমূহের ব্যানারে একত্রিত হয়েছি। আমাদের জোটের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা হওয়া পর্যন্ত হেফাজতের নেতৃত্ব আমাদের সহযোগিতা করবেন।
জোটভুক্ত সাতটি দল হলো—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
নতুন এই ঐক্যের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, জোটভুক্ত কয়েকটি দল নিজেদের আগের রাজনৈতিক অবস্থানও বজায় রাখবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি (ইজহার) জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবে সক্রিয় থাকবে। অন্যদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সমমনা ইসলামী দলসমূহের ব্যানারেও যুক্ত থাকবে।
এ বিষয়ে আতাউল্লাহ আমিন বলেন, আমরা রাজনৈতিকভাবে ওই জোটগুলোতে থাকব। আর সামগ্রিক পরিস্থিতি, ইসলামবিরোধী তৎপরতা নিয়ে আমরা এই জোট থেকে থাকব। স্থানীয় নির্বাচনেও সমমনা দলসমূহের ব্যানারেও সক্রিয় থাকতে পারি।
অর্থাৎ, জাতীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান জোটগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখেই নির্দিষ্ট ইস্যুতে একযোগে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে দলগুলোর।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুহিউদ্দিন রাব্বানী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছিল। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সাতটি দল একটি অভিন্ন ব্যানারে এসেছে।
তিনি বলেন, হেফাজতের নেতৃত্বে কোনো জোট এটা নয়, হেফাজত মুরুব্বির ভূমিকায় আছে।
এর আগে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহর আহ্বানে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় সাতটি ইসলামী দলের নেতারা নীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা জানান। পরে ২৭ সেপ্টেম্বর সেখানে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। ওই সময় ঢাকায় ২২ অক্টোবরের বৈঠকে ঐক্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
একটি ইসলামী দলের প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকায় তাঁকে সেই জোট থেকে বের করে আনার বিষয়ে আগে থেকেই চাপ ছিল। তবে তাঁর অনড় অবস্থানের কারণে দলটিকে ওই জোট থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন সমমনা জোটে যুক্ত হলেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আগের জোটেও থাকছে।
এদিকে, আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আতাউল্লাহ আমিন। ওই বৈঠকে জোটের পরবর্তী কার্যক্রম ও পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন ও আহমদ আলী, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির ও মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজীসহ অন্যরা।
বৈঠকে হেফাজতের নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল ও আইয়ুব বাবুনগরীও উপস্থিত ছিলেন।