মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন কেউ দুর্নীতির অভিযোগে, কেউ বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে, আবার কেউ পদ ছেড়েছেন নীতিগত মতবিরোধ কিংবা রাজনৈতিক চাপের মুখে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ ও অপসারণের এমন ঘটনা কম নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ, অপসারণ কিংবা দায়িত্ব হারানোর নজির রয়েছে। তবে মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জেরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েন ইশরাক। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের কথা জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিএনপি ও সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে অভিযানে কোনো ভুল করেননি বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে তিনজন সদস্য বাদ পড়লেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে গত ২২ আগস্ট মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। এর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।
তবে ইশরাকের ঘটনা আলোচনায় এসেছে ভিন্ন কারণে। অতীতের অধিকাংশ পদত্যাগ ও অপসারণের পেছনে ছিল দুর্নীতির অভিযোগ, বিতর্কিত মন্তব্য, নীতিগত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার এমন নজির আগে দেখা যায়নি।
আওয়ামী লীগ আমলে পদ ছাড়েন পাঁচজন
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ বা মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের ঘটনা ঘটে।
২০০৯ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। তিনি পরে জানিয়েছিলেন, মন্ত্রণালয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। সরকারের প্রভাবশালী একটি অংশ তাঁর সংস্কারমূলক উদ্যোগে বাধা দিচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
২০১২ সালে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ টাকা বহনকারী একটি গাড়ি বিজিবির সদর দপ্তরে প্রবেশের ঘটনা সামনে আসে। ওই টাকা রেলমন্ত্রীর বাড়িতে নেওয়া হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছিলেন। তীব্র সমালোচনার মুখে ১৬ এপ্রিল পদত্যাগের ঘোষণা দেন সুরঞ্জিত। তবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পদত্যাগপত্র সরাসরি গ্রহণ না করে তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে রাখেন। পরে দুদকের তদন্তে তিনি অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পান।
একই বছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করার পর অর্থায়ন পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২৩ জুলাই তিনি পদ ছাড়েন। তবে দুদকের তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি এবং ২০১৭ সালে কানাডার আদালতেও এ-সংক্রান্ত মামলা খারিজ হয়।
২০১৪ সালে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ, তাবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এর জেরে ১২ অক্টোবর তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়।
এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত মন্তব্য ও ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান।
বিএনপি সরকারের আমলেও পদত্যাগের নজির
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ও বিতর্ক ও অভিযোগের মুখে মন্ত্রিসভা ছাড়তে হয়েছিল দুই সদস্যকে।
২০০৪ সালে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ সময় তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে আসে। পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে মার্চে পদত্যাগ করেন আমির খসরু।
২০০৫ সালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান নাইকোর কাছ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি উপহার নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ১৮ জুন দেশে ফিরে পদত্যাগ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ-সংকটের সময় অবশ্য প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে পদত্যাগ করানো হয়নি; বরং ২০০৬ সালের মার্চে তাঁকে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নব্বইয়ের দশকে পদত্যাগ ও অপসারণ
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময় দুজন মন্ত্রীর পদত্যাগের নজির রয়েছে। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারের নীতির বাইরে বক্তব্য দেওয়ার পর তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা পদত্যাগ করেন। ১৯৯৫ সালে সারসংকট ও কৃষক আন্দোলনের পর পদ ছাড়তে হয় শিল্পমন্ত্রী জহিরউদ্দিন খানকে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর গ্রেনেড নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে পড়েন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম। পরে তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়।
ঢাকার কয়েকটি বড় বস্তিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আফসার উদ্দিন আহমদ। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন। এ ছাড়া কূটনৈতিক পাসপোর্টের পাশাপাশি সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন।
এরশাদের আমলে মন্ত্রিসভায় ঘন ঘন রদবদল
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় বারবার পরিবর্তন আসে। শুধু মন্ত্রী নয়, প্রধানমন্ত্রীর পদেও একাধিকবার রদবদল হয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থনীতি পরিচালনা ও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৮৪ সালের ৯ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। একই বছর প্রধানমন্ত্রী হওয়া আতাউর রহমান খানও এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে নয় মাসের মাথায় পদ ছাড়েন।
শিক্ষানীতি নিয়ে ছাত্র আন্দোলন ও প্রাণহানির ঘটনার পর আবদুল মজিদ খানকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরানো হয়। পরে তাঁকে পরিকল্পনামন্ত্রী করা হলেও একপর্যায়ে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে পাঠানো হয়।
১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে প্রধানমন্ত্রী হন মওদুদ আহমদ। ১৯৮৯ সালে তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান কাজী জাফর আহমদ। ১৯৯০ সালের মার্চে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারও পদত্যাগ করেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই পদত্যাগের ইতিহাস
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। ১৯৭৩ সালে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী পদত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে তাঁদের দূরত্ব বাড়ছিল বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
উইকিলিকসের ফাঁস করা একটি মার্কিন নথি অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশ সরকারের ছয়জন মন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শেখ আবদুল আজিজ, শামসুল হক, মোল্লা জালাল উদ্দীন আহমেদ, মতিউর রহমান, এম এ জি ওসমানী, মফিজ চৌধুরী, আমিরুল ইসলাম, নূরজাহান মুর্শিদ ও আবদুল মালেক খান। নথিতে এসব পদত্যাগের পেছনে একক কোনো কারণ বা অভিন্ন ধরন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নজির রয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দল ও সরকারে ডানপন্থী ধারার প্রভাব বাড়ার বিরোধিতা করে শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ ১৯৭৮ সালের ১১ অক্টোবর পদত্যাগ করেন।
কেন আলাদা ইশরাকের পদত্যাগ?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রীদের পদত্যাগের কারণ একেক সময়ে একেক রকম ছিল। দুর্নীতির অভিযোগ, বিতর্কিত বক্তব্য, নীতিগত বিরোধ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক চাপ—বিভিন্ন কারণেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদত্যাগের ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি, আবার কাউকে সরাসরি অপসারণ করা হয়েছে কিংবা দায়িত্ব বদলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিশেষ দিক হলো, মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বিতর্কের মুখে সরকারের অবস্থান—এই প্রশ্নগুলো আবারও সামনে