নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় স্ত্রী ও সন্তানদের বিরুদ্ধে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সৌদিপ্রবাসী সিরাজুল ইসলাম (৫০)। গত ১৩ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার পর থেকে তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার প্রায় দেড় মাস পার হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
সিরাজুল ইসলাম উপজেলার ৫ নম্বর মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মলংচর ভূঁইয়া বাড়ির বাসিন্দা। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি চাটখিল থানায় অভিযোগ করেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে দেখা করে নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে এখনো সমস্যার সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম ও স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে পারিবারিকভাবে রেহানা বেগমের (৪৫) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বিয়ের কয়েক বছর পর সিরাজুল ইসলাম সৌদি আরবে চাকরিতে যান এবং প্রায় ১৫ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে তাঁর উপার্জিত অর্থ স্ত্রী রেহানা বেগমের ব্যাংক হিসাবে পাঠাতেন বলে দাবি করেন তিনি।
সিরাজুল ইসলামের অভিযোগ, তাঁর পাঠানো অর্থে স্ত্রী নিজের নামে একাধিক সম্পত্তি কেনেন। এমনকি বসতবাড়ির সম্পত্তিও প্রতারণার মাধ্যমে নিজের নামে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। তবে এসব সম্পত্তির মালিকানা ও দলিলসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রবাস থেকে দেশে ফিরে কয়েক বছর আগে ঢাকায় চাকরি শুরু করেন সিরাজুল ইসলাম। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর ডান পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর তিনি চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েন বলে জানান। তাঁর অভিযোগ, এ অবস্থায় স্ত্রী ও সন্তানেরা তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবা দেননি। বরং ঢাকায় তাঁদের ভবনের একটি কক্ষে আটকে রেখে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগেও বাধা দেওয়া হয়।
সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ও সেবা নিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে স্ত্রী রেহানা বেগম, মেয়ে হাসনাত জাহান রুনা (২৭) এবং দুই ছেলে রেসালাত হাসান (২৫) ও নাহিদ হাসান (২২) তাঁকে মারধর করেন। পরে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে সেখানে আর প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ১৩ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় একটি মসজিদের এক কোণে আশ্রয় নেন সিরাজুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, স্ত্রীকে ভয় পাওয়ায় স্থানীয় অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাটখিল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিন উদ্দিন, অ্যাডভোকেট আনোয়ারা হোসেন, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া (৫০), আবদুল মন্নান (৭০), ছানা উল্যা (৬০) ও প্রবাসী আলমগীর হোসেনসহ কয়েকজন ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত রেহানা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁদের ভরণপোষণ না দেওয়ার কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে এ কারণে সিরাজুল ইসলামকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি সুস্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মোন্নাফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজানুর রহমান জানান, বিষয়টি জানার পর তিনি থানা পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সিরাজুল ইসলাম বর্তমানে মসজিদে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তা তাঁর জানা ছিল না। বিষয়টি জেনে তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।