সংঘর্ষের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ, অনিশ্চয়তায় পাহাড়ের জনজীবন

শাকিল আহমেদ

সারাদেশ

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের উজো বাজারে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনার পরও কাটেনি উত্তেজনা। সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ

2026-10-24T11:50:55+00:00
2026-10-24T11:50:55+00:00
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
 
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
রাঙামাটি-খাগড়াছড়িতে আধাবেলা অবরোধ
সংঘর্ষের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ, অনিশ্চয়তায় পাহাড়ের জনজীবন
অবরোধের দ্বিতীয় দিন ছিল থমথমে পাহাড়, সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ ও নিরাপত্তার দাবি
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫০ এএম 
সংঘর্ষের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ, অনিশ্চয়তায় পাহাড়ের জনজীবন
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের উজো বাজারে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনার পরও কাটেনি উত্তেজনা। সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুক্রবার দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। ফাঁকা হয়ে পড়েছে পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ও আশপাশের এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তোলে, এর প্রতিবাদে আজ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ।

সাজেকের এই পরিস্থিতি কেবল পর্যটন সড়ক বন্ধ থাকার সংকট নয়। এর পেছনে রয়েছে পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। সংঘাতের তাৎক্ষণিক কারণ সড়ক অবরোধ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা, আস্থা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার প্রশ্ন।

তিন দফা দাবিতে অবরোধ, উত্তেজনা উজো বাজারে : সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে। প্রশাসনের আশ্বাসে সাময়িক বিরতির পর ১৫ অক্টোবর আবার কর্মসূচি শুরু হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর অবরোধ স্থগিত রাখা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অবরোধের ঘোষণা দেয় সংগঠন দুটি।

তাদের প্রধান দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে কথিত হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।

অবরোধকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রশাসনের কাছে দাবি জানালেও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে বিরোধের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত।

পর্যটক সরানোর সময় গোলাগুলি : এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ। পর্যটকবাহী গাড়িবহর উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধের কারণে চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। পরে সড়ক উন্মুক্ত করে পর্যটকদের নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ঘিরে উত্তেজনা বাড়ে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবের ভাষ্য অনুযায়ী, অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন। একপর্যায়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গুলির জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। পুলিশের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে। কে প্রথম গুলি চালিয়েছে এবং সংঘর্ষ কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ঘটনাস্থলের আলামত ও নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘর্ষের পর পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে গোলাগুলিতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ছয়জন নিরাপত্তা সদস্যের আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে এনেছে।

দ্বিতীয় দিনেও উদ্বেগ, নতুন অবরোধের কর্মসূচি : শুক্রবার সাজেক ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জনজীবনেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের টহল ও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে সাজেকবাসীর আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আজ শনিবার ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমার বিবৃতিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের প্রতিবাদও জানানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। নতুন এই কর্মসূচির ফলে দুই পার্বত্য জেলায় সড়ক ও নৌপথে চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংকটের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে : সাজেকের সড়ক অবরোধের প্রভাব পর্যটকদের দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সড়ক যোগাযোগ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত কঠিন হয়ে ওঠে। জুমের ফসল বাজারে নিতে না পারলে কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পর্যটননির্ভর সাজেকে রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন, খাবারের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা পর্যটকদের যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তার কারণে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকলে আগাম বুকিং বাতিল, আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও চাপ বাড়বে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সাধারণ মানুষ যেন ভয়ভীতি, সহিংসতা কিংবা চলাচলে বাধার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও প্রশাসনের।

সমাধানে দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংলাপ : সাজেকের সংকট মোকাবিলায় শুধু সড়কে নিরাপত্তা বাড়ানো কিংবা অবরোধ তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। অবরোধকারীদের অভিযোগ, জেএসএসের পাল্টা বক্তব্য এবং সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা, সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অবরোধকারী সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাসিন্দা ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সংলাপ জরুরি। জরুরি সেবা ও সাধারণ মানুষের চলাচল সচল রাখার ব্যবস্থা না থাকলে রাজনৈতিক বিরোধের মূল্য দিতে হবে নিরপরাধ মানুষকেই।

উজো বাজারের গোলাগুলি তাই সাজেকের জন্য শুধু একটি দিনের সহিংস ঘটনা নয়; এটি পাহাড়ে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক আস্থার বড় পরীক্ষা। কারা সংঘর্ষে জড়িত ছিল, সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগের ভিত্তি কতটা এবং প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবায়নে কী ঘাটতি রয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তেই মিলতে পারে। সেই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকা সুরক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ না এলে অবরোধ সাময়িকভাবে থামলেও সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: