দেশের পানিসংকট নিরসনে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করে দ্রুততম সময়ে শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা নদীর পানি দিন দিন কমে যাচ্ছে। দেশের পানিসংকট মোকাবিলায় পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশের মানুষের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে রাজশাহীসহ আশপাশের প্রায় ১৪টি জেলার মানুষ উপকৃত হবেন।
পাঁচ বছরে খনন হবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল
কৃষকদের সেচসুবিধা নিশ্চিত করতে সারা দেশে খাল খনন ও নদী সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে আট মাসে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, খাল খননের ফলে কৃষকরা সেচের পানি পাবেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও সহায়তা হবে। উত্তরাঞ্চল দেশের শস্যভাণ্ডার হলেও এ অঞ্চলের মানুষ পানির সংকটে ভোগেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। বরেন্দ্র প্রকল্পও সে সময় কার্যকর হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে দেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
আখচাষিদের জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা
জনসভার শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণের কার্যক্রম চালু করার পাশাপাশি ১৫ জন আখচাষির হাতে চেক তুলে দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশের কৃষি বাঁচবে। কৃষকদের উৎপাদন ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাবে।
শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ
দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, গত সাত মাসে ছয়টি বন্ধ কারখানা চালু করা হয়েছে। আগামী ১২ মাসে সারা দেশে আরও প্রায় ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, যাতে তাঁরা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা নিয়ে সতর্কবার্তা
দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, এ কাজে দেশের ভেতরের একটি পক্ষও সহযোগিতা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশে যেন কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয়
রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের অধিকার সমান। কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। দেশের উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে পূজা উদযাপন তহবিল গঠন, মন্দির স্থাপন এবং দুর্গাপূজায় সরকারি অনুদান ও সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এটি ছিল প্রথম রাজশাহী সফর। রাজশিয়ার কর্মসূচি শেষে তাঁর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল।