মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা, এখন শুধু লাশ ফেরত চান মা

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

সারাদেশ

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই দিন আগে বাংলাদেশি নারী সুইটি আক্তারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল তাঁর বাবার। মেয়ে যে

2026-10-20T19:36:14+00:00
2026-10-20T19:36:14+00:00
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা, এখন শুধু লাশ ফেরত চান মা
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই দিন আগে বাংলাদেশি নারী সুইটি আক্তারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল তাঁর বাবার। মেয়ে যে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তা জানতেন না পরিবারের কেউ। এখন মেয়ের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না মা-বাবা। তাঁদের একটাই আকুতি—মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক, শেষবারের মতো যেন দেখতে পারেন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার এক গ্রামের বাসিন্দা সুইটি আক্তার। পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের অভাব ঘোচাতে এবং একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২৩ সালের মার্চে একটি এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

সুইটির বাবা ফজল মিয়া জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। পরে একদিন ফোন করে সুইটি জানান, তিনি কারাগারে আছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন নারী অবৈধভাবে গাড়ি কেনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে পরিবারকে জানিয়েছিলেন তিনি। একই ঘটনায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান সুইটি।

ফজল মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকার সময় কখনো এক সপ্তাহ, কখনো এক মাস পর মেয়ের সঙ্গে কথা হতো। একপর্যায়ে প্রায় এক বছর যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর সুইটি আবার ফোন করেন। তখনো তিনি কারাগারে থাকার কথা জানান এবং ফোন করতে না পারলেও মা-বাবাকে দুশ্চিন্তা না করতে বলেন।

সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে কথা হয় সুইটির। কিন্তু নিজের বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানাননি তিনি। এর দুই দিন পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বরাতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর এ তথ্য জানায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।

মঙ্গলবার সকালে সুইটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছেন। ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন তাঁর মা জহুরা বেগম ও বাবা ফজল মিয়া। মেয়ের কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জহুরা বেগম বলেন, মা, তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না...আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।

মেয়ের এমন পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। বারবার বলছেন, মেয়েকে একবার দেখতে চান।

সুইটির জীবনে অভাব আর অনিশ্চয়তা ছিল দীর্ঘদিনের সঙ্গী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয়। সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। পরে পরিবারের চাপে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

এরপর নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ ও বাবার সংসারের অভাব দূর করার আশায় বিদেশে পাড়ি জমান সুইটি। বর্তমানে তাঁর নয় বছর বয়সী মেয়ে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার বলেন, স্বামীর সংসারে সুখ পাননি সুইটি। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে ভাগ্য বদলাতে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। সুইটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না স্বজনেরা। তাঁদের ধারণা, তিনি কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে তাঁদের দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সালমা বলেন, আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। বাপ-মায়ের অভাব...বাইরে গেছে। ওরা পাঁচটা বোন। চাচার কোনো ছেলে নাই। ওর যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।

সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানার পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবার। মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনে এমন পরিণতির কোনো ইঙ্গিত না পাওয়ায় আরও অসহায় বোধ করছেন তাঁর বাবা-মা।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহুরুল আলম জানিয়েছেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন।

এদিকে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রায়ের কপি চাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। সুইটির পরিবার এখন মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁদের শেষ চাওয়া, একবার যেন মেয়ের মুখ দেখতে পারেন।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: