চাকরির আশায় ২৩০০টির বেশি আবেদন, তবু বেকার পিএইচডিধারী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা আর মেধার স্বীকৃতি—সবই আছে তাঁর ঝুলিতে। যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেছেন। তাঁর

2026-10-20T19:11:13+00:00
2026-10-20T19:11:13+00:00
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
চাকরির আশায় ২৩০০টির বেশি আবেদন, তবু বেকার পিএইচডিধারী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১১ পিএম 
চাকরির আশায় ২৩০০টির বেশি আবেদন, তবু বেকার পিএইচডিধারী
উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা আর মেধার স্বীকৃতি—সবই আছে তাঁর ঝুলিতে। যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়ও জায়গা করে নিয়েছে নোবেল কমিটির আলোচনায়। অথচ এত যোগ্যতা থাকার পরও একটি স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না জ্যাক ওয়েইস। দুই বছরেরও কম সময়ে দুই হাজার ৩০০টির বেশি পদে আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের দেখা পাননি ৩০ বছর বয়সী এই গবেষক।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্টলেক সিটির বাসিন্দা ওয়েইস এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন। নিজের বিশেষায়িত বিষয়ে চাকরি না পেয়ে একপর্যায়ে ভিন্ন পেশার দিকেও ঝুঁকতে হয়েছে তাঁকে। সফটওয়্যার প্রকৌশলীর পদে আবেদন করার পাশাপাশি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্যও আবেদন করেছেন, যেখানে হিমায়িত কাঁকড়ার কেক বিক্রি করা হয়। তাঁর এই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সংগ্রাম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ওয়েইসের চাকরি খোঁজার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উঠে এসেছে, কীভাবে উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং উল্লেখযোগ্য একাডেমিক অর্জন থাকা সত্ত্বেও চাকরির বাজারে বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ছেন তিনি।

ওয়েইসের শিক্ষাজীবন ছিল যথেষ্ট উজ্জ্বল। যুক্তরাষ্ট্রের রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক শেষ করার পর ২০১৮ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে শুরু করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল রাসায়নিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন নীতি এবং অণুগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া।

বরফ কীভাবে তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণাও বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। ২০২৪ সালে নোবেল কমিটির এক আলোচনায় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার বোঝাতে তাঁর গবেষণাকর্মের উল্লেখ করা হয়। তবে নোবেল কমিটির আলোচনায় গবেষণার উল্লেখ থাকা আর নোবেল পুরস্কার পাওয়া এক বিষয় নয়।

২০২৪ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ওয়েইস ভেবেছিলেন, তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠানে পেশাজীবন শুরু করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। একের পর এক আবেদন করেও তিনি প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছিলেন না।

পিএইচডি শেষ করার পর শুরুতে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণাসংক্রান্ত পদে আবেদন করেন ওয়েইস। পাশাপাশি জাতীয় গবেষণাগারগুলোর মর্যাদাপূর্ণ ফেলোশিপ পাওয়ার চেষ্টাও করেন। কিন্তু অধিকাংশ আবেদনেই কোনো উত্তর আসেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রত্যাখ্যানের বার্তা পাঠায়।

নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের চাকরিগুলোতে সুযোগ না পেয়ে ধীরে ধীরে আবেদনের পরিধি বাড়াতে থাকেন তিনি। প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে কাজ খুঁজতে শুরু করেন। এমনকি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন পদেও আবেদন করেন।

চাকরি পাওয়ার আশায় প্রিন্সটন ও রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন ওয়েইস। তাঁর ধারণা ছিল, পরিচিতদের মাধ্যমে অন্তত কোনো প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকারের সুযোগ মিলতে পারে। কিন্তু সেখান থেকেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। কেউ কেউ তাঁকে নিয়মিত চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখতে এবং নতুন সুযোগের জন্য আবেদন চালিয়ে যেতে পরামর্শ দেন।

এভাবে আবেদন করতে করতে সংখ্যাটা দাঁড়ায় দুই হাজার ৩০০-এর বেশি। এতগুলো আবেদনের পরও একটি স্থায়ী চাকরি না পাওয়া তাঁর জন্য যেমন হতাশার, তেমনি তাঁর পরিবারকেও বিস্মিত করেছে।

দীর্ঘ সময় চাকরি খোঁজার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়েইস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে বিশেষজ্ঞ নিয়োগকারী একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ পান। সেখানে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ঘণ্টায় ৭০ ডলার। আপাতদৃষ্টিতে এটি ছিল স্বস্তির খবর। অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেই কাজের ধারাবাহিকতা ছিল না। কোনো সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পেতেন, আবার কোনো সপ্তাহে কাজের পরিমাণ কমে দাঁড়াত মাত্র চার ঘণ্টায়। ফলে আয়ও অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন কাজের পরিমাণ ক্রমাগত কমতে থাকে। একপর্যায়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজই পাননি তিনি। পরে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে একটি গ্রুপ চ্যাটে তাঁকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

ফলে অল্প সময়ের জন্য তৈরি হওয়া কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাটিও শেষ হয়ে যায়। আবারও নতুন করে চাকরি খোঁজার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন ওয়েইস।

দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে চাকরি খুঁজেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার বিকল্প পেশার কথা ভাবছেন ওয়েইস। আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এ লক্ষ্যে আগামী নভেম্বরে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তবে শুধু নতুন করে পড়াশোনার ওপর নির্ভর করে থাকতে চান না তিনি। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টাও করছেন। তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর একটি ড্রোন তৈরি করা, যা ক্ষতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত আগ্রাসী আগাছা অপসারণে ব্যবহার করা যাবে।

অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের চাকরি অনুসন্ধানে সাফল্য না এলেও নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিকল্প আয়ের পথ তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি। গবেষণার অভিজ্ঞতাকে নতুন কোনো প্রযুক্তিগত উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন।

ওয়েইসের বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক। ছেলের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করলে তাঁর চাকরি পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগবে, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি।

ছেলের চাকরি না পাওয়ার কারণ খুঁজতে তাঁর মা হলি কারভার্স আবেদনপত্রগুলো পর্যালোচনা করেন। নিয়োগদাতাদের কাছে নেতিবাচক মনে হতে পারে, এমন কোনো বিষয় সেগুলোতে রয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্পষ্ট কোনো সমস্যা তাঁর চোখে পড়েনি।

ছেলের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে হলি বলেন, পরিস্থিতিটি সত্যিই অপ্রত্যাশিত। কেন এমন হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ওয়েইসের বাবা জন ওয়েইসও ছেলের অভিজ্ঞতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ছেলেকে চাকরি পাওয়ার জন্য এভাবে সংগ্রাম করতে হবে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

পরিবারের এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু একজন তরুণের কর্মসংস্থানের সংকট নয়; বরং উচ্চশিক্ষা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পরও প্রত্যাশিত পেশাগত স্থিতি না পাওয়ার হতাশাও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাংবাদিক লিন্ডসে এলিস যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওয়েইসের সাক্ষাৎকার নেন। তাঁর অভিজ্ঞতা এমন একটি শ্রমবাজারের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের এই পরিস্থিতিকে অনেক ক্ষেত্রে ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগে আগের তুলনায় সতর্ক থাকছে। একই সঙ্গে কর্মরত কর্মীরাও সহজে চাকরি পরিবর্তন করছেন না। ফলে নতুন করে কর্মজীবন শুরু করতে চাওয়া ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে সদ্য স্নাতক, পিএইচডিধারী এবং বিশেষায়িত বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তাঁদের অনেকেই নির্দিষ্ট ধরনের গবেষণা বা প্রযুক্তিনির্ভর পদের জন্য প্রস্তুত হন। সেই পদগুলোতে নিয়োগ কমে গেলে অন্য ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়।

প্রতিবেদনটিতে দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকা মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৭ সপ্তাহ ধরে বেকার থাকা মানুষের অনুপাত প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে করোনাভাইরাস মহামারি ও তার পরবর্তী সময়কে এই তুলনার বাইরে রাখা হয়েছে।

জ্যাক ওয়েইসের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—উচ্চশিক্ষা, গবেষণার স্বীকৃতি ও বিশেষায়িত দক্ষতা থাকলেও চাকরি পাওয়া নিশ্চিত নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রতিষ্ঠানের নিয়োগনীতি এবং শ্রমবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতিও একজন প্রার্থীর পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে একজনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো শ্রমবাজারের চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। ওয়েইসের ঘটনা মূলত দেখায়, প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদেরও দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হতে পারে।

দুই হাজার ৩০০টির বেশি আবেদন করেও চাকরি না পাওয়া ওয়েইস এখন নতুন পথ খুঁজছেন। কখনো আইন বিষয়ে পড়াশোনা, কখনো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ—বিকল্পের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তাঁর এই সংগ্রাম উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়: বছরের পর বছর পড়াশোনা, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও যদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হয়, তাহলে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে আরও কার্যকর করা সম্ভব?

সূত্র: এনডিটিভি ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: