ইউরোপজুড়ে বন্য মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরিবেশ ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মহাদেশটির অধিকাংশ অঞ্চলে এসব পরাগায়নকারী পতঙ্গের প্রজাতিগত সমৃদ্ধি কমছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রও বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদনে প্রকাশিত গবেষণাটি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌমাছি ও হোভার ফ্লাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। এতে মহাদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আল্পস অঞ্চল বাদে ইউরোপের অধিকাংশ এলাকায় নতুন প্রজাতির উপস্থিতি বাড়ার তুলনায় প্রজাতি হারানোর প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে আটলান্টিক ও কন্টিনেন্টাল অঞ্চলে এই পতন স্পষ্ট।
গবেষকদের মতে, সব প্রজাতি একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। পরিবেশের পরিবর্তনে সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো ক্রমেই কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সহনশীল কিছু প্রজাতি টিকে থাকছে বা বিস্তার লাভ করছে। ফলে পরাগায়নকারী পতঙ্গের সামগ্রিক বৈচিত্র্য ও গঠনে পরিবর্তন আসছে। বাইরে থেকে প্রজাতির সংখ্যা স্থিতিশীল মনে হলেও এর আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে পারে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অধিকাংশ বন্য সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং বহু প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণীর মাধ্যমে পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। এসব পতঙ্গের সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদের বংশবিস্তার ব্যাহত হতে পারে, কমতে পারে ফসলের উৎপাদনও। একই সঙ্গে খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর জীবনও হুমকিতে পড়তে পারে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিবেশবিদ কার্লোস মার্তিনেজ-নুনেজের মতে, কিছু প্রজাতি টিকে আছে বা বাড়ছে বলেই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ইতিবাচক ভাবার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ও আবাসস্থল ধ্বংসের চাপ বাড়লে বর্তমানে টিকে থাকা প্রজাতিগুলোও বিপদে পড়তে পারে। তবে সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গত শতাব্দীতে নথিভুক্ত প্রজাতিগুলোর প্রায় ৯১ শতাংশকে ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত একবার দেখা গেছে। যেসব প্রজাতিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি, তাদের মধ্যে কিছু প্রজাতি ইউরোপ থেকে হারিয়ে গিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, পর্যবেক্ষণে না পাওয়া মানেই কোনো প্রজাতি নিশ্চিতভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে—এমন নয়। ঐতিহাসিক নথিতেও এসব প্রজাতির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল।
বাস্ক সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের গবেষক আইনহোয়া মাত্রাগের মতে, নতুন গবেষণাটি পরাগায়নকারী পতঙ্গের আবাসস্থল ও সংখ্যা কমে যাওয়ার দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। আগে এ বিষয়ে অধিকাংশ তথ্য পাওয়া যেত যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে। নতুন গবেষণায় মহাদেশের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে একই ধরনের প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যদিও অঞ্চলভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, কীটনাশকের ব্যবহার, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব পরাগায়নকারী পতঙ্গের টিকে থাকার পরিবেশ সংকুচিত করছে। এসব চাপ অব্যাহত থাকলে শুধু বন্যপ্রাণী নয়, কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বাস্তুতন্ত্রের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদ গ্রহণের পর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ১৭ সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য রক্ষার চলমান লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অন্তত ৩০ শতাংশ স্থল ও সামুদ্রিক অঞ্চল সংরক্ষণ, ক্ষতিকর ভর্তুকি সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা।
মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়াকে তাই কেবল একটি পতঙ্গের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উদ্ভিদের বংশবিস্তার, খাদ্য উৎপাদন এবং প্রকৃতির সামগ্রিক ভারসাম্য। কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান