জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিক্ষোভের জেরে দেশটির একাধিক শহরে দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাট ও সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে ও সীমিত পরিসরে কারফিউ জারি করা হতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। তবে কোন কোন এলাকায় কারফিউ কার্যকর হবে, তা পরে ঘোষণা করা হবে।
এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের প্রতিনিধিদের বিশেষ ক্ষমতা দেন। এর আওতায় প্রয়োজন মনে করলে তাঁরা নির্দিষ্ট কিছু জমায়েত নিষিদ্ধ করতে পারবেন। সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্সেই শহরে সোমবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জরুরি অবস্থা ঘোষণা কিংবা সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। এই অনুচ্ছেদে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত কারফিউকে পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী গ্যাব্রিয়েল আতাল প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যেতে পারে।
এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেছেন, বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পরও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সহিংসতা দমনে ৬০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। রোববার তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেন। নুনেজ জানান, ঘটে যাওয়া ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিয়েই তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।
গত শনিবারের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর দুই হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
রাজধানী প্যারিস, লিওঁ ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দোকানপাটে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি নগর ভবনে আগুন লেগে ছাদ ধসে পড়ে। প্যারিসে অন্তত পাঁচটি দোকান লুটপাটের শিকার হয়। লুটেরাদের হামলায় একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রবেশপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সহিংসতার মধ্যে সোমবার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর লুভরেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন শিল্পকলার শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অবরোধের কারণে জাদুঘরটির প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ব্যাহত হয়।
প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলি লর বেকুয়ো জানান, রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীতে প্রায় ১৩০ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁদের সবাইকে লুটপাটের অভিযোগে আটক করা হয়নি; অন্য অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলে সরকারের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের নেতারা আগামী শনিবার আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাক্ট টু’। এতে দেশটিতে চলমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।