ফ্রান্সের বিক্ষোভ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় ও পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে রিপাবলিকানদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। একই সঙ্গে মুসলিম রাজনীতিকদের নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য এবং ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট।
অন্যদিকে একাধিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত মিলছে। অর্থনীতি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে। ফলে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে চাপের মুখে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের ঘটনাকে সামনে এনে ভোটারদের সতর্ক করার কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতারা।
ফ্রান্সের সংকট, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত শিক্ষা খাতের নানা সমস্যা নিয়ে। শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে ক্ষোভ থেকে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। পরে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বৃদ্ধি ও মজুরি বাড়ানোর দাবি তোলে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের কিছু অংশ লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক নগর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও সামনে আসে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে, এমনকি প্যারিসের কিছু এলাকাতেও রাতের কারফিউ জারি করা হয়।
এই অস্থিরতাকেই অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প। সোমবার কানসাসে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি দাবি করেন, অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টরা একসময়ের মহান ফ্রান্সকে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধ্বংস করছে।
মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তা বুঝতে চাইলে ফ্রান্সের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। তাঁর অভিযোগ, ফ্রান্সে যা ঘটছে, ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চান।
মাখোঁকে আক্রমণ, প্যারিস নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর অভিবাসননীতি নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বন্ধ করার পদক্ষেপ নিলেও ফ্রান্স সেই পথে হাঁটেনি।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে প্যারিস দ্রুত একটি মুসলিম শহরে পরিণত হতে পারে। তাঁর এ বক্তব্যে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে বিতর্কিত রাজনৈতিক ভাষ্যও উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টেও ফ্রান্সের নেতাদের দ্রুত সীমান্ত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে ফ্রান্সের বিক্ষোভের পেছনে শিক্ষা, মজুরি, পেনশন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো যেসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে, সেগুলোর পরিবর্তে ট্রাম্পের বক্তব্যে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ভ্যান্স-জনসনেরও একই সুর
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন।
লিমোজের ঐতিহাসিক নগর ভবনে আগুন লাগার একটি ভিডিও শেয়ার করে ভ্যান্স ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য উদারপন্থীদের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমা উদারপন্থীরা অভিবাসীদের সামাজিকভাবে একীভূত করার বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন।
জনসনের দাবি, উন্মুক্ত সীমান্তের নীতি ফ্রান্সকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের নীতির সঙ্গেও তিনি এর তুলনা করেন। সিনেটর এরিক স্মিটও ফ্রান্সের পরিস্থিতির জন্য বামপন্থীদের দায়ী করেছেন।
ভ্যান্স মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ভোট দেওয়ার সময় ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা মনে রাখা উচিত। তাঁর ভাষ্য, ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চান।
তবে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও শিক্ষায় অর্থায়নের ঘাটতি, আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে তরুণদের বিক্ষোভ হয়েছে। স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, ইউরোপে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়টি কেবল অভিবাসন বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়।
মুসলিম রাজনীতিকদের নাম নিয়ে বিদ্রূপ, নতুন বিতর্ক
কানসাসের সমাবেশে ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করতে গিয়ে মুসলিম পরিচয় ও নাম নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্যও করেছেন ট্রাম্প। তাঁর লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ, কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইব। বক্তব্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যনামও টেনে আনেন তিনি।
এল-সাইয়েদের নামের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই প্রার্থীকে ‘মোহাম্মদ’ বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর দাবি, ওই অঞ্চলের মানুষের নাম নিয়ে সন্দেহ হলে ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকলে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক বিদ্রূপের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে টেনে আনার কারণে তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গেও ট্রাম্পের অবস্থানের মিল দেখা যাচ্ছে। দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলা সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী চরমপন্থা ও শহরতলির অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। এর আগে ট্রাম্প ও ভ্যান্স প্রকাশ্যে মেরিন লে পেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
জনপ্রিয়তা কমছে ট্রাম্পের, বাড়ছে অসন্তোষ
ফ্রান্সের ঘটনাকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করলেও যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের যৌথ জরিপে তাঁর প্রতি সমর্থনের হার ৩৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন ট্রাম্প।
এমন ধারণা পোষণকারীদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকও রয়েছেন। তাঁদের ৩৪ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্প নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াতে প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ ধরনের ধারণা পোষণকারীর হার ১২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতি নিয়েও হতাশা স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৮ শতাংশ নাগরিক বলেছেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁদের আর্থিক অবস্থা আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে। ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘তেমন ভালো নয়’ অথবা ‘খারাপ’ বলে মূল্যায়ন করেছেন।
এ ছাড়া ৬৭ শতাংশ মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ট্রাম্প আন্তরিক নন। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু রাখার বিষয়ে তাঁর আন্তরিকতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বিরোধ এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রচেষ্টা নিয়েও বিতর্ক চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সাময়িক বাধা দিয়েছেন এক ফেডারেল বিচারক।
কানসাসেও চ্যালেঞ্জের মুখে রিপাবলিকানরা
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কানসাসেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। আট বছর পর অঙ্গরাজ্যটিতে নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন ট্রাম্প। সেখানে তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে সমর্থন জোরদার করা।
মার্শাল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের কাছ থেকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। হ্যামিলটন একজন মেথডিস্ট গির্জার জ্যেষ্ঠ যাজক। জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারের তৃতীয় প্রান্তিকে হ্যামিলটন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছেন। বিপরীতে মার্শালের সংগ্রহ ছিল প্রায় আট লাখ ডলার। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান ঘাঁটিতে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলটির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো এক কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বাধা বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।
জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সিনেটের লড়াই এখনো অনিশ্চিত। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা বহাল থাকবে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের অস্থিরতাকে সামনে রেখে অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে ভোটারদের সংগঠিত করতে চাইছেন ট্রাম্প। কিন্তু অর্থনীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থের অভিযোগ এবং জনপ্রিয়তা হ্রাসের চাপ কাটিয়ে এই কৌশল রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সুবিধা এনে দিতে পারবে কি না, তা নির্ধারিত হবে নভেম্বরের ভোটে।