কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় বাণিজ্যিক হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ৩২ হাজার কৃষক পরিবারের সদস্যরা। মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে ওঠায় দাম কমে যায়। অন্যদিকে, সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পচনশীল কৃষিপণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। এতে অনেক সময় উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না তাঁরা।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার ও আধুনিক সেচব্যবস্থার কারণে উপজেলায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকেরা। স্থানীয়দের মতে, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিক হিমাগার স্থাপন করা হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকার তরুণদের কৃষি ও কৃষিপণ্য বিপণনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দক্ষিণাঞ্চলের নয়টি ওয়ার্ড এবং কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর, চৌয়ারা, বারপাড়া, বৃহত্তর গলিয়ারা, জোড়কানন পূর্ব ও জোড়কানন পশ্চিম ইউনিয়নে ২০০৮ সালের জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৩২ হাজার কৃষক পরিবার রয়েছে।
এসব এলাকার কৃষকেরা ধান, আলু, মরিচ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, গাজর, টমেটো, বেগুন, ঢ্যাঁড়সসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফসল ও সবজি আবাদ করেন। কিন্তু একই সময়ে অধিকাংশ কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত মৌসুমে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে একদিকে কৃষকের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বারপাড়া ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার ও চৌয়ারা ইউনিয়নের শীষপুর গ্রামের কৃষক আবু তালেব জানান, রতনপুর এলাকার মজুমদার কোল্ড স্টোরেজটি প্রায় ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছেন না।
বাণিজ্যিক হিমাগারের অভাবের মধ্যে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এলাকায় দুটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়েছে।
এর একটি বৃহত্তর গলিয়ারা ইউনিয়নের নলকুড়ি গ্রামের কৃষক আবদুস সোবহানের বাড়িতে এবং অন্যটি কুমিল্লা নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাগমারা এলাকার কৃষক আবুল কালাম আজাদের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা প্রায় পাঁচ মেট্রিক টন।
তবে স্থানীয় কৃষকদের চাহিদার তুলনায় এই সংরক্ষণব্যবস্থা সীমিত। তাই বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক হিমাগার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জোনায়েদ কবির খান দৈনিক ভোরের ডাককে বলেন, বাণিজ্যিক হিমাগারের অভাবে উৎপাদিত মৌসুমে সবজির দাম কমে যায়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ সময় তাঁদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়।
তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধির প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে নলকুড়ি ও দক্ষিণ বাগমারা এলাকায় দুটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন করে তিনজন কৃষক মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের জন্য আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সেগুলো স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, মিনি কোল্ড স্টোরেজের পাশাপাশি উপজেলায় বড় পরিসরে বাণিজ্যিক হিমাগার স্থাপনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে। এতে উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করা সম্ভব হবে এবং কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন।