বহুদিনের জং ধরে থাকা পাটকলে আবার ঘুরতে শুরু করেছে চাকা। ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। পর্যায়ক্রমে দেশের বন্ধ হয়ে থাকা সব পাটকল আবার চালুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্রুত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জুটমিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন প্রচেষ্টায় প্রায় ৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাটকলগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফেরায়; এটি দেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও পাটশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। যা দেশের শিল্প খাত এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।
বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা এসব কারখানা চালু হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বেড়েছে এবং বিপুল মানুষের জীবিকার নতুন পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে আরও ৫০টি বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল আগামী এক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়ানো এবং অব্যবহৃত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যেই বন্ধ মিলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকা ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি মিল লিজের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৪টি মিলের লিজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টি মিলে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব মিলে প্রায় ৯,৫০০ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দৈনিক প্রায় ১৬০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে সরকারের এই মহতী উদ্যোগের ফলে দেশের শিল্প খাতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে এবং প্রায় ৩ লাখ বেকার নাগরিক কাজের সুযোগ পাবেন। পাট শ্রমিকরা বলছেন, পাটকল চালু হওয়াতে আমাদের খুব ভালো হইছে। আমরা গরিব মানুষ, এখানে আইসা আশ্রয় নিছি। আগের তিন বছর আমরা খুব অসহায় ছিলাম। বর্তমানে পাটের মিলগুলোতে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে জানিয়ে লোকসানি মিলগুলো নিয়ে লাভের আশা নতুন মালিক পক্ষের। আকিজ জুট মিলের জেনারেল ম্যানেজার মো. ইসহাক আলী জানান, ‘প্রায় ২০টা তাঁত আমরা নিয়মিত পরিচালনা করছি। আমরা এখন সম্পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছি। যখন আমরা পণ্যগুলো উৎপাদন করতে পারব, তখন লাভের মুখ দেখব।’
জানা যায়, দেশের পাটকলগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত করাই বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার। নতুন এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে এবং বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুন করে প্রায় ৩ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকার ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে দক্ষ বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। দীর্ঘমেয়াদি লিজ, রাজস্ব ভাগাভাগি কিংবা যৌথ মালিকানাভিত্তিক বিভিন্ন পিপিপি মডেলে রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে অধিকাংশ বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে।
পাটশিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলেছে, পরিবেশদূষণ রোধে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে ও পাটজাত পণ্য ব্যবহারে সরকারের প্রচার-প্রচারণা, দেশে-বিদেশে পাটজাত পণ্যের চাহিদা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এতে পাটশিল্পের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। গত এক যুগে দিনাজপুরে গড়ে উঠেছে সাতটি পাটকল। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে সাত থেকে আট হাজার মানুষের। পাশাপাশি পাট উৎপাদন ও পাটজাত পণ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কয়েক’শ কুটির শিল্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব শিল্প ও পাট চাষের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। তথ্যমতে, পাটকলগুলোয় মূলত হেশিয়ান ব্যাগ (পাতলা ব্যাগ), শেকিং ব্যাগ (মোটা ব্যাগ) ও সুতলি উৎপাদন হয়। সেই সুতলি যাচ্ছে বিভিন্ন হস্তজাত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। সেখানে সুতলি দিয়ে কারুপণ্য তৈরি হচ্ছে। আবার পাটকলে উৎপাদিত বস্তা দেশ-বিদেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের উৎপাদনে থাকা পাটকলগুলো অধিকাংশই রপ্তানিমুখী। এই পাটকলগুলো নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এসব কারখানার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শ্রমিকই নারী। অপরদিকে স্থানীয়ভাবে পাটকল গড়ে ওঠায় কৃষকেরাও পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। রাজশাহী জুট মিলস লিমিটেডের নারী শ্রমিক কুলসুম বলেন, ‘আমাদের আগে হয় বাড়িতে বসে থাকতে হতো, না হয় খেতে কাজ করতে হতো। এখানে জুট মিল হওয়ায় আমরা কাজ করতে পারছি। এতে করে সংসারে সুদিন ফিরেছে।’
বরেন্দ্র টেক্সটাইল লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক হামিদুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালে এই কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে প্রায় দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী। তাদের গড় আয় মাসে ১০ হাজার টাকা। বরেন্দ্র টেক্সটাইল মিলস একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। কাঁটাখালী জুট মিলস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুরশীদ আলম বলেন, পাট খুবই সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বর্তমানে বেশ কয়েকটি জুট মিল গড়ে ওঠায় পাটের চাহিদা বেড়েছে। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের দৈনিক উৎপাদন এখন প্রায় ২০ মেট্রিক টন। এর ৯০ শতাংশই বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার রাজীব কবিরাজ বললেন, কারখানার কর্মীরা ভর্তুকি মূল্য ৮ টাকায় দুপুরের খাবার খেতে পারেন। যাদের বাড়ি অনেক দূরে, তারা মাসে ২০০ টাকায় ডরমিটরিতে থেকে কাজ করতে পারেন। বর্তমানে দেড় শতাধিক কর্মী ডরমিটরিতে থাকেন। পরে শ্যামপুরে রাজশাহী পাটকলে গিয়ে দেখা যায়, একটি কারখানা ভবনে জুতা, ছাতা ও তাঁবু উৎপাদন চলছে পুরোদমে। পাশের একটি ভবনের সংস্কারকাজ চলছে। সেখানে সারি সারি মেশিন আমদানি করে রাখা হয়েছে।
পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন জুট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, এখন বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫ দেশের বাইরেও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ ১২০টি দেশে এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববাজারে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পাটজাত শপিং ব্যাগ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই পাট শিল্প বিশ্বের নজর কাড়বে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. নার্গীস আক্তার বলেন, পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন করায় স্থানীয় পর্যায়ে পাটের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ কারণে মোট চাহিদাও বেড়ে গেছে। তিনি জানান, দেশে পাট উৎপাদন হচ্ছে ৭৫ লাখ বেল। উৎপাদন আরো বৃদ্ধির জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলন পার্থক্য কমানো হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির কাজ চলছে।