নিরাপত্তার বলয়ে পূজামন্ডপ, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর পূজার আনুষ্ঠানিকতায় শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আনন্দ যেন নিরাপত্তার উদ্বেগে ম্লান না হয়, সে জন্য

2026-10-17T12:06:51+00:00
2026-10-17T14:09:44+00:00
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
নিরাপত্তার বলয়ে পূজামন্ডপ, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
রাজধানীর ২৫৭ মন্ডপে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের পাহারা
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম  আপডেট: ১৭.১০.২০২৬ ২:০৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর পূজার আনুষ্ঠানিকতায় শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আনন্দ যেন নিরাপত্তার উদ্বেগে ম্লান না হয়, সে জন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূজামন্ডপ, মন্দির, প্রতিমা তৈরির স্থান, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনসমাগমস্থলে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। মাঠে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার-ভিডিপি। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।

গতকাল শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এই উৎসব। পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, বিসর্জনস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানি ঠেকানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো। সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, টহল ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
 
রাজধানীর ২৫৭ মন্ডপে পুলিশের পাহারা : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাজধানীতে এবার ২৫৭টি পূজামন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মন্ডপের গুরুত্ব ও নিরাপত্তার প্রয়োজন বিবেচনায় ভাগ করে সাজানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রতিটি মন্ডপে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও মন্ডপের নিরাপত্তায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। পূজামন্ডপের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, আশপাশের সড়ক এবং দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের সদস্যদের নজরদারি, টহল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত দলের প্রস্তুতিও রয়েছে। মন্ডপ কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের নির্দেশনায় মন্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখার কথা বলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ডপে আর্চওয়ে গেট স্থাপন এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ যথাসম্ভব আলাদা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক বস্তু বা আচরণ চোখে পড়লে নিজেরা ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

মাঠে ছয় হাজারের বেশি এসআরবি সদস্য : দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারাদেশে ছয় হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে বিশেষ কার্যক্রম চালাচ্ছে এসআরবি। গত ১৩ অক্টোবর শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। পূজামন্ডপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় টহল এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে এসআরবির মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ বলেন, অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছে এসআরবি। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বাহিনীটির বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রমে টহলযান, মোটরসাইকেল, ডগ স্কোয়াড ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। প্রতিমা পরিবহন ও বিসর্জনের পথেও নজরদারি থাকবে। 

প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন : সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার পূজামন্ডপের নিরাপত্তায় গতকাল থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমানের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে এবং ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের আশপাশের মন্ডপগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজিবির পরিকল্পনায় সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার ২ হাজার ৭২৭টি মন্ডপের কথা আগে জানানো হয়েছিল। তবে ১৬ অক্টোবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংখ্যা ২ হাজার ৭৮৭ বলা হয়েছে। ফলে মন্ডপের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব এলাকায় টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য এলাকাতেও সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বিজিবি।

আনসার-ভিডিপির দুই লাখের বেশি সদস্য : পূজামন্ডপের নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় অংশের জনবল নিয়ে মাঠে রয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। বাহিনীটির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮৮ জন পুরুষ এবং ৬৬ হাজার ৩৩০ জন নারী সদস্য। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য এসব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ডপগুলোতে বেশি সদস্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ডপের প্রবেশপথ, দর্শনার্থীদের চলাচল এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন তারা। প্রতিমা তৈরির স্থান থেকে শুরু করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

নদীপথ ও বিসর্জনস্থলেও নজরদারি : উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৩ হাজার ৪০০ কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছে বাহিনীটি। মন্দির ও পূজামন্ডপের পাশাপাশি বিসর্জনস্থলে নিরাপত্তা, নদীপথে টহল এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবেন তারা। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নদীতীর ও ঘাটগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়তে পারে। এ সময় নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। 

গুজব ও উসকানি ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ : নিরাপত্তার প্রস্তুতি থাকলেও উৎসবের দিনগুলোতে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের নির্দেশনা যাচাই না করে তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা, সন্দেহজনক তৎপরতা দ্রুত জানানো এবং মন্ডপে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পূজা উদ্যাপন কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক ও দর্শনার্থীদের সহযোগিতাও নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব মিলিয়ে রাজধানী থেকে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা, গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাই হবে এ ব্যবস্থার মূল পরীক্ষা। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে নির্বিঘ্নে উৎসব উদ্যাপনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি আয়োজক ও সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: