জ্বালানি হিসেবে তেল, গ্যাস কিংবা কয়লার দিন যখন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, তখনই ইউরেনিয়ামের যুগে পা রাখতে চলেছে বাংলাদেশ। এটা পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সূচনা। এরই মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে সফলভাবে রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি অর্জন করেছে। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করা হয়। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অংশ। চলতি মাসে প্রথম ইউনিটের সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন হলেই আগামী মাসে ডিসেম্বরে এই কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও আগামী ছয় মাসের মধ্যে রুপপুর থেকে মিলবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, পারমাণবিক চুল্লিপাত্রে শক্তি উৎপাদন শুরু হতে পারে চলতি মাসের শেষ দিকে। শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৩ থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এখান থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্রে এখন জোরেশোরে চলছে শেষ মুহূর্তের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষামূলক সরবরাহ সফল হলে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ১৯৬১ সালে শুরু করা পারমাণবিক ব্যবহারের যে যাত্রা, সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। দেশের বিজ্ঞান খাতে এটি বড় রকমের মাইলফলক। পারমাণবিক বিব্রিয়াটি এখন ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এই অর্জনের ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত হওয়ার (গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন) পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, চুল্লিপাত্র (রিঅ্যাক্টর) ক্রিটিক্যালিটি অর্জন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি দেশের বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সক্ষমতার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর বাংলাদেশ এখন তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, জ্বালানি নিয়েও কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রতি সপ্তাহে একটি করে জ্বালানির চালান আসার কথা রয়েছে। অল্প কিছু পরীক্ষা শেষ হলেই পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
জানা যায়, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে পারমাণবিক শক্তিকে বিবেচনা করছে সরকার। কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে দুই কোটি টন এবং গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে রূপপুর। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নির্মাণ চলাকালে দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন রূপপুরে। গত বছর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই।
এর আগে, চলতি বছরের মে মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের ফিশন বা নিউক্লিয়ার বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্পের চাপে ঘুরবে টারবাইন, যার মাধ্যমে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে জ্বালানি লোডিং ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে ১৬ ও ১৮ মেগাপাসকেল (এমপিএ) উচ্চচাপে ভালভটির পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের মাধ্যমে এর কার্যক্রম আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রাথমিক পর্যায়ে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। মূলত, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকটের কারণে বিপাকে বাংলাদেশ, বাড়ছে লোডশেডিং। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে বারবারই সামনে আসছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম। কবে নাগাদ এখান থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ মিলবে, সেই অপেক্ষায়ও দেশবাসী।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি প্রবেশ বড় মাইলফলক। তবে মানুষ বিদ্যুৎ পাওয়ার পর পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মূল অর্জন নিশ্চিত হবে। এটি সফল হওয়ার মানে হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো যাবে। তাই আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা অবাস্তব নয়, চাইলে তা অর্জন করা সম্ভব।