যুদ্ধের আতঙ্ক, একের পর এক ফ্লাইট বাতিল আর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার শঙ্কা—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সৌদি আরবগামী প্রবাসীরা। কেউ ছুটি শেষে কাজে ফিরতে পারছেন না, কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। তারপরও জীবিকা ও পরিবারের খরচ চালানোর তাগিদে সৌদি আরবে ফিরতে মরিয়া তাঁরা।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে ঢাকা থেকে সৌদিগামী সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট ৮৯টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৪ হাজার ৬৫৫ জন যাত্রী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদিগামী কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার কথা জানা যায়। তাঁদের অনেকেরই ভিসা বা ছুটির মেয়াদ শেষের পথে। ফ্লাইটের নতুন তারিখ পাওয়া কিংবা বিকল্প পথে গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা।
বরিশালের প্রবাসী হাবিল খানের বুধবার দুপুরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর। হাবিল জানান, তাঁর ভিসার মেয়াদ আর মাত্র তিন দিন রয়েছে। এ অবস্থায় টিকিট পরিবর্তন করে দ্রুত সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
হাবিল বলেন, ছুটি বা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যেকোনোভাবে তাঁকে সৌদি আরবে ফিরতে হবে। যুদ্ধের কারণে ভয় থাকলেও জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যাওয়া ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ নেই বলেও জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিদারুল আলমেরও বুধবার বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাঁকেও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। দিদারুল বলেন, তাঁর ছুটি শেষ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে যাত্রার তারিখের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
দিদারুলের ভাষায়, ‘যুদ্ধের মধ্যেও যাচ্ছি, কারণ দেশে কী কাজ করব? ভয় আছে, তারপরও যেতে হবে। জীবন চালাতে হবে, বাড়ি চালাতে হবে।’
নোয়াখালীর আরাফাতের ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে। তবে বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর বাবা আকবর হোসেন ছেলেকে এখনই পাঠাতে চান না। তাঁর আশঙ্কা, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার পেছনে ছেলের বড় অঙ্কের খরচ রয়েছে, যা এখনো উঠে আসেনি। এ কারণে আরাফাতও ফিরে যাওয়ার বিষয়ে অনড় বলে জানান তাঁর বাবা।
হাবিল, দিদারুল কিংবা আরাফাতের মতো ছুটি শেষে দেশে আসা অনেক প্রবাসীই এখন একই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, কারও ছুটি শেষ। নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে চাকরি, ভিসা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন তাঁরা। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সহায়তাও কামনা করছেন প্রবাসীরা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম সীমিত থাকায় এ পর্যন্ত সরাসরি ৩৯টি এবং ট্রানজিট ৫০টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ফ্লাইটের সংখ্যা ৮৯টি।
ক্ষতিগ্রস্ত সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি রয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, সালামএয়ারের চারটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফ্লাইটের এ বিঘ্নের কারণে যাত্রীদের ভ্রমণসূচি, সংযোগকারী ফ্লাইট এবং গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকে বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইটের নতুন সময় জানতে চাইছেন, আবার কেউ টিকিট পরিবর্তন কিংবা বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাত্রীরা যাতে অযথা বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য আগেই বাতিলের তথ্য জানানো হয়েছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মুখপাত্র কামরুল ইসলামও জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদেরও ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে এবং এ বিষয়ে আগেই যাত্রীদের জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনায় অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। এ কারণে সৌদিগামী এবং সৌদি আরব থেকে অন্য গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।