মা ইলিশ রক্ষায় শুধু আইন প্রয়োগ, পুলিশ ও কোস্টগার্ড মোতায়েন কিংবা সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়; এ জন্য জেলেদের মানসিক অঙ্গীকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম দাসাদি গ্রামের বড় খান বাড়ির মাঠে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬ উপলক্ষে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ ও সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা হলে পরবর্তী বছরে ইলিশের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলেদের সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি।
জেলেদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সরাসরি ইলিশ ধরেন। তাই ইলিশের জীবনচক্র, প্রজনন ও সংরক্ষণের বিষয়ে অনেক ভালো জানেন। মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে আগামী বছরও ইলিশ পাওয়া যাবে। তাই মা ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব আপনাদেরই সবচেয়ে বেশি।
সরকারি সহায়তার পাশাপাশি জেলেদের ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জেলেদের ২৫ কেজি চাল দেওয়া হলেও তাঁদের নিজেদের সচেতনতা ছাড়া ইলিশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, আপনি যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত না হন যে মা ইলিশ ধরবেন না, তাহলে ২৫ কেজি কেন, ১০০ কেজি চাল দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না।
মন্ত্রী আরও বলেন, একসময় চাঁদপুর অঞ্চলে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। ইলিশ পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য এখানে অনেক বরফকল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সেই কর্মচাঞ্চল্যও অনেকটা হারিয়ে গেছে। ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়াতে হলে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করতে হবে।
মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়ে জেলেদের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ সময় অনেক পরিবারকে সংসার চালাতে সমস্যায় পড়তে হয়। কেউ কেউ ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা তাঁদের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শুধু সাময়িক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে জেলেদের জন্য টেকসই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে প্রচলিত পদ্ধতিতে পুকুরে মাছ চাষ সব সময় সহজ নয়। বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে মাছ ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে নদীতে খাঁচায় মাছ চাষসহ আধুনিক ও উপযোগী প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
তিনি বলেন, জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ও জেলেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি জেলেদের নিজেদের ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়বে। এর সুফল ভোগ করবেন জেলে পরিবারসহ মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সেলিম উল্যা সেলিম। এ সময় স্থানীয় মৎস্যজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ করেন।