কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুন তাজমীনকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে তার সোয়াব ও ব্যবহৃত পোশাকের ডিএনএ পরীক্ষা করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব আলামত সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হবে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের পুরো ঘটনা ও অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালমাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল্লাহ আল ফারুক জানান, সোয়াব, পোশাক, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তে কোনো বিষয় বাদ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নিহত কিশোরীর সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয় রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু নামে এক তরুণের। তাজমীন নিখোঁজ হওয়ার আগে কক্সবাজারে গিয়ে রিয়াজের সঙ্গে অবস্থান করেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। রিয়াজের বক্তব্য ও স্বীকারোক্তি থেকেও এ বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে রিয়াজকে আটক করে পুলিশ। জেলা পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কক্সবাজারের একটি হোটেলে কিশোরীকে ডেকে নেওয়ার ঘটনায় ওই তরুণকে আইনের আওতায় আনা হবে।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে রিয়াজ নিখোঁজ হওয়ার রাতের কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা শহরের বাসায় ফিরে তাজমীন প্রধান ফটক বন্ধ পান। মা-বাবাকে ফোনে না পেয়ে তিনি এক ‘আঙ্কেলের’ সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর বাসায় যাওয়ার কথা জানান।
রিয়াজের দাবি, ভিডিও কলে তাজমীনকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দেখতে পেয়ে তিনি বকাঝকা করেন। এরপর তাজমীন ফোন কেটে দেন এবং পরে বার্তায় জানান, সকালে বাসায় ফিরবেন। রিয়াজের ধারণা, তাজমীন যাঁকে ‘আঙ্কেল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি অটোরিকশাচালকও হতে পারেন। তবে এ বিষয়ে তদন্তে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ফিরে তাজমীন কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় নামেন। সেখান থেকে তাঁকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। তবে বাসায় না নিয়ে তাঁকে লালমাই উপজেলার একটি নির্জন কৃষিজমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি দামি আইফোন নিয়ে সুমন অন্য একটি অটোরিকশায় পালিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি কৃষিজমি থেকে তাজমীনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত শনিবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সুমন তাজমীনকে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, তাজমীন কক্সবাজারে কার সঙ্গে গিয়েছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কারও ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, নিহতের সোয়াব ও পোশাক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর কাজ চলছে। মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
ডিএনএ ও মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।