সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনিক নজরদারি উপেক্ষা করে পটুয়াখালীর দুমকিতে পায়রা ও পাণ্ডব নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে মা ইলিশ শিকার। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রতিদিন মাছ ধরতে নদীতে নামছেন এক শ্রেণির জেলে। স্থানীয়দের দাবি, কোথাও জীবিকার তাগিদে, আবার কোথাও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকে মাছ ধরার ‘উৎসব’ হিসেবে দেখছেন জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পায়রা নদীর পাঙ্গাশিয়া, আলগী, লেবুখালী, আংগারিয়ার জেলেবাড়ি ও বাহেরচর এলাকা এবং মুরাদিয়া ও পাণ্ডব নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবাধে চলছে মাছ শিকার। অত্যাধুনিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে নদীতে জাল ফেলছেন জেলেরা।
রবিবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পায়রা সেতু থেকে জেলেবাড়ি এলাকা পরিদর্শনকালে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি মাছ ধরার নৌকা দেখা যায়। এসব নৌকা নিয়ে জেলেদের নির্বিঘ্নে নদীতে জাল পেতে মা ইলিশ শিকার করতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
আংগারিয়া ইউনিয়নের লঞ্চঘাট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, ‘কেউ পেটের ক্ষুধায় মাছ ধরতে নামে, আবার কারও কাছে এটা উৎসব। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসে কেউ কেউ অত্যাধুনিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে নামেন। তাঁদের কাছে এই ২২ দিন মাছ ধরার উৎসব।’
তবে অনেক জেলে বলছেন, সরকারি সহায়তা দিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উপজেলার পাতাবুনিয়া জেলেবাড়ি এলাকার সুকুমার দাস বলেন, সরকার থেকে দেওয়া ২৫ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের প্রয়োজন মেটে না। একটি পরিবারে চার-পাঁচজন সদস্য থাকেন। এর মধ্যে এনজিওর ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে হয়। কিস্তি আদায়ে ঋণদাতারা বাড়িতে এসে চাপ দেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুধার তাড়নায় অনেক জেলে জাল নিয়ে নদীতে নামেন।
জেলে হান্নানের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের অনেকে সরকারি চাল পাচ্ছেন না, অথচ জেলে নন—এমন ব্যক্তিরাও সহায়তা পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারি বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, নদী, জেলে ও ইলিশ পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জেলেরা যাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে পারেন, সে জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে প্রকৃত জেলেদের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনের জন্য তাঁদের ঋণ মওকুফ করা হলে মা ইলিশ রক্ষায় জেলেদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, তাঁদের টহল দল সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন করেছে। সীমিত জনবল ও একটি মাত্র টহল দল থাকায় সব এলাকায় সমানভাবে নজরদারি করা কঠিন হচ্ছে। তবে টহল জোরদারের চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ খায়রুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নদীতীরবর্তী এলাকার সচেতন বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে মা ইলিশ নিধন চলতে থাকলে ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। পাঙ্গাশিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে মা ইলিশ নিধন অব্যাহত থাকলে অচিরেই নদীগুলো ইলিশশূন্য হয়ে পড়তে পারে। এ জন্য তিনি দ্রুত কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।