যশোরের শার্শায় প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিন শতাধিক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। গ্রামাঞ্চলে কাজের অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও শামুক সংগ্রহে নামছে। প্রতিদিন কেজিপ্রতি মাত্র ৭ টাকা দরে শামুক বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তারা। তবে নির্বিচারে শামুক আহরণে পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ডিহি, লক্ষণপুর, বাহাদুরপুর, শার্শা সদর ও নিজামপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের জলাশয়গুলোতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ করছেন নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যরা। কেউ হেঁটে, আবার কেউ ডিঙি নৌকায় চড়ে খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয় থেকে শামুক কুড়িয়ে আনছেন। পরে বিকেলে ইউনিয়নভিত্তিক নির্ধারিত স্থানে শামুক জড়ো করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন তারা।
সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজন দিনে ৩০ থেকে ৭০ কেজি পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি কেজি ৭ টাকা দরে বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু মাঠে কৃষিকাজসহ অন্য কাজের সুযোগ কম থাকায় জীবিকার তাগিদে এ পেশায় যুক্ত থাকতে হচ্ছে তাদের।
ডিহি ইউনিয়নের তেবাড়িয়া জেলেপল্লীর শামুক সংগ্রহকারী দীলিপ মন্ডল, বিজয়, রিনা রাণী, আরতি দাসী, রাধে বালা ও রফিকুল ইসলাম এবং নিজামপুর ইউনিয়নের পোতাপাড়ার পবন মন্ডল, অসিম তরফদার, আলো বিশ্বাস, মিলন রাণী ও নলিতা রাণীসহ অনেকে জানান, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে শামুক সংগ্রহ করেন তারা।
তাদের ভাষ্য, মাঠে তেমন কাজ না থাকায় বাধ্য হয়েই শামুক সংগ্রহ করতে হচ্ছে। দিন শেষে শামুক বিক্রির টাকা দিয়েই কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এত অল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শামুক ব্যবসায়ী শার্শা উপজেলার স্বরূপদাহ এলাকার কামাল হোসেন, আকরম আলী ও নিত্য মন্ডল জানান, দক্ষিণ ও উত্তর শার্শায় পৃথক দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপ এ বছর কয়েকটি ইউনিয়নের সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মণ শামুক কিনছে। প্রতি কেজি শামুকের ক্রয়মূল্য ৭ টাকা।
তারা জানান, সংগৃহীত শামুক খুলনার চেঁচুড়ি-কাপালিয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। সেখানে মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করার পর শামুক চিংড়ি ও পাঙ্গাশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এ বছর খাল-বিল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ কম থাকায় এবং পানিতে অ্যালার্জিজনিত সমস্যার কারণে আগের বছরের তুলনায় শামুক সংগ্রহকারী পরিবারের সংখ্যা কমেছে।
শার্শা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা ‘ভোরের ডাক’কে বলেন, সরকারিভাবে শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণের প্রকল্প রয়েছে, তবে সেটি এ অঞ্চলে প্রযোজ্য নয়।
তিনি বলেন, শামুক জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানির বিভিন্ন দূষিত পদার্থ পরিশোধনে সহায়তার মাধ্যমে জলজ প্রাণীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে শামুক।
পলাশ বালা আরও বলেন, অতিরিক্ত শামুক আহরণ বা নিধন করা হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যারা শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন, তাদের নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একদিকে কর্মসংস্থানের অভাবে দরিদ্র পরিবারের জীবিকার লড়াই, অন্যদিকে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ—শার্শায় শামুক আহরণ ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন দ্বিমুখী বাস্তবতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, দরিদ্র পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক জলজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।