মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর জনজীবনে ব্যাপক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর ও স্থাপনা। ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত রাখা হয়। একের পর এক পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কিত বাসিন্দাদের অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে পানামার দক্ষিণাঞ্চলে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭ দশমিক ৮ মাইল গভীরে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও হতাহতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। হেরেরা প্রদেশের ৭৪ বছর বয়সী বাসিন্দা রিকার্ডো ব্রাউন জানান, তাদের বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লাস মিনাস এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয়
ভূমিকম্পের প্রভাবে পানামার ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরগি। রাজধানী পানামা সিটির টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে শহরের মেট্রো রেল পরিষেবাও স্থগিত করা হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বেশ কয়েকটি অফিস থেকে কর্মীদের আগেভাগে ছুটি দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ক্ষতির পরিমাণ পানামার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ হতে পারে। তবে এটি প্রাথমিক অনুমান; প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্টর লুকের মতে, আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমের সক্রিয়তার সঙ্গে ভূমিকম্পটির সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই চ্যুতি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা চাপ থেকে শক্তি নির্গত হওয়ার ফলে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
নেস্টর লুক জানান, রাজধানী পানামা সিটিতে প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকায় কম্পনের স্থায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হওয়ায় অনেক বাসিন্দা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি হেরেরা প্রদেশের লা পিতালোজা এলাকার নিকটে। রাজধানী থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের উৎপত্তিস্থল হলেও পানামা সিটিতে এর প্রভাব অনুভূত হয়। প্রতিবেশী দেশ কোস্টারিকার রাজধানী সান হোসেতেও কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর জানিয়েছে রয়টার্স।
গির্জা ও ভবনে ক্ষয়ক্ষতির খবর
উৎপত্তিস্থল ও রাজধানীর মাঝামাঝি পেনোনোমে শহরে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য সামনে এসেছে। রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে একটি গির্জা ও আশপাশের কয়েকটি ভবনে ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। কিছু স্থাপনার অংশ ধসে পড়ার দৃশ্যও রয়েছে।
পানামার বেসামরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান ওমর স্মিথ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টেলিমেত্রো রিপোর্টাকে জানান, হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং উপকূলীয় লস সান্তোস প্রদেশ থেকেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ জরুরি হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কা কেটে গেছে। ফলে এ মুহূর্তে সুনামি নিয়ে কোনো সতর্কতা নেই বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ
ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো। তিনি জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে সোমবার দেশজুড়ে ভূমিকম্প মোকাবিলায় জরুরি স্থানান্তর মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্যোগের সময় মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি যাচাই করাই এ মহড়ার লক্ষ্য।
শক্তিশালী কম্পনের পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করাই এখন দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে কতটা সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: রয়টার্স